দারিদ্র্য দমাতে পারেনি পলাশকে; দিনমজুর বাবার ছেলে এসএসসিতে পেল জিপিএ-৫
মোস্তাফিজার রহমান জাহাঙ্গীর, কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি

চরম দারিদ্র্য ও অভাব-অনটন কোনো বাবাই হতে পারেনি পলাশ চন্দ্র রায়ের সাফল্যের অগ্রযাত্রায়। দিনমজুর বাবার সন্তান পলাশ ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বড়ভিটা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে অর্জন করেছে কাঙ্ক্ষিত জিপিএ-৫। তাঁর এই অসাধারণ কৃতিত্বে পরিবার, শিক্ষক ও পুরো এলাকায় আনন্দের বন্যা বইলেও অর্থাভাবে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
অদম্য মেধাবী পলাশ চন্দ্র রায় কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বড়ভিটা ইউনিয়নের ছড়ারপাড় জেলেপাড়ার বাসিন্দা। বাবা সুধাংশু চন্দ্র রায় পেশায় একজন দিনমজুর এবং মা পূর্ণিমা রানী গৃহিণী। মাত্র পাঁচ শতাংশ ভিটেবাড়িতে বাবা ও চাচাসহ তিনটি পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই। দুই ভাই-বোনের মধ্যে পলাশ বড়।
অভাব ও চরম প্রতিকূলতার দিনগুলো
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, অভাব-অনটনের কারণে পড়ালেখার পাশাপাশি প্রায়শই বাবাকে কাজের হাটে যেতে সাহায্য করতে হতো পলাশকে। প্রয়োজনীয় বই-খাতা কেনা কিংবা প্রাইভেট পড়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাঁর ছিল না। তবুও নিজের অদম্য ইচ্ছা, বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণা এবং শিক্ষকদের সহযোগিতায় অসাধ্য সাধন করেছে সে।
নিজের অনুভূতি ও অনিশ্চয়তার কথা জানিয়ে পলাশ চন্দ্র রায় বলে—
”আমার বাবা একজন দিনমজুর। তীব্র অভাবের মধ্যেও অদম্য ইচ্ছা শক্তিতে পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছি এবং ভালো ফলাফল করেছি। আমি উচ্চশিক্ষা অর্জন করে পরিবারের দারিদ্র্য ঘোচাতে চাই। তবে আমার পরিবারের পক্ষে কলেজের পড়ালেখার খরচ চালানো অসম্ভব। সরকার কিংবা সমাজের কোনো বিত্তবান ব্যক্তি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে আমার স্বপ্ন পূরণ সম্ভব হতো।”
পলাশের মা পূর্ণিমা রানী আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন—
”অনেক কষ্ট আর না খেয়ে দিন পার করে ছেলেকে এ পর্যন্ত পড়িয়েছি। আমাদের খুব ইচ্ছা ছেলে আরও পড়াশোনা করুক, বড় মানুষ হোক। কিন্তু আমাদের তো সেই সামর্থ্য নেই। বিত্তবান কেউ যদি একটু সহায়তার হাত বাড়ান, তবেই ওর পড়ালেখাটা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।”
শিক্ষকদের প্রশংসা ও সহযোগিতার আকুতি
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বড়ভিটা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এ বছর মোট ৭২ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল, যার মধ্যে ৫৫ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। এদের মধ্যে একমাত্র পলাশ চন্দ্র রায়ই জিপিএ-৫ অর্জন করে প্রতিষ্ঠানের সুনাম কুড়িয়েছে।
বড়ভিটা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শরিফ উদ্দিন পলাশের ফলাফলে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন—
”পলাশ অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান হলেও লেখাপড়ায় দারুণ মনোযোগী। বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাঁকে সবসময় সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। সে জিপিএ-৫ পেয়ে বিদ্যালয় ও বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করেছে। তবে তাঁর উচ্চশিক্ষার পথ ধরে রাখাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মেধাবী এই শিক্ষার্থীর পড়ালেখা যেন মাঝপথে থেমে না যায়, সেজন্য সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার বিনীত আহ্বান জানাচ্ছি।”
পলাশের স্বপ্ন—উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠে পরিবার ও দেশের সেবা করা। মেধাবী এই তরুণের স্বপ্নপূরণে এখন প্রয়োজন সমাজের বিত্তবানদের আর্থিক সহায়তা।
