বরিশালের উজিরপুরে ১০ কোটির আর্চ ব্রিজ: ধামুরা খালে যেন এক টুকরো ‘হাতিরঝিল’
দৈনিক জাহান ডেস্ক

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ধামুরা খালের ওপর নির্মিত দৃষ্টিনন্দন আর্চ সেতুটি এখন আর কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, রূপ নিয়েছে এই অঞ্চলের নতুন পর্যটন আকর্ষণে। প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই নান্দনিক সেতুটি চালুর ফলে একদিকে যেমন দূর হয়েছে দীর্ঘদিনের যাতায়াত কষ্ট, অন্যদিকে বিকাশিত হচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতি ও বিনোদন।
ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যের মেলবন্ধন
উজিরপুরের শোলক ইউনিয়নের ধামুরা খালটি অঞ্চলটির এক শতবর্ষী ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাশয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বর্বরোচিত গণহত্যার স্মৃতি বহনকারী এই খালের বুক চিরে তৈরি ধনুকের মতো বাঁকানো আর্চ ব্রিজটি দূর থেকে দেখে কোনো আধুনিক বিনোদনকেন্দ্রের অংশ বলে মনে হয়। খালের স্বচ্ছ জল আর দুই পাশের সবুজ প্রকৃতির মাঝে সেতুর এই স্থাপত্যশৈলী দেখতে প্রতিদিনই ভিড় জমাচ্ছেন স্থানীয় ও দূর-দূরান্তের দর্শনার্থীরা। সৌন্দর্য ও কাঠামোর দিক থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা একে রাজধানীর হাতিরঝিলের সেতুর সঙ্গে তুলনা করছেন।
অর্থায়ন ও নির্মাণের তথ্য
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ‘প্রোগ্রাম ফর সাপোর্টিং রুরাল ব্রিজেস’ প্রকল্পের আওতায় সানুহার আরঅ্যান্ডএইচ-ধামুরা জিসি-জল্লা-সাতলা জিসি সড়কের ধামুরা খালের ওপর ৫৫ দশমিক ৬ মিটার দীর্ঘ এই আরসিসি আর্চ সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার (জিওবি) ও বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে ৯ কোটি ৯৪ লাখ ২৩ হাজার ৫৭৩ টাকা। ২০২৩ সালের ৪ মে শুরু হওয়া নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল সম্পন্ন করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘এম/এস এমএই-শামস-উপকূল (জেভি)’। এরপর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মাধ্যমে এটি সর্বসাধারণের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
স্বস্তি এসেছে যাতায়াতে, গতি পাচ্ছে অর্থনীতি
সানুহার-ধামুরা-জল্লা-সাতলা সড়কে সেতুটি চালু হওয়ায় স্থানীয়দের ভোগান্তির অবসান ঘটেছে। আগে পুরোনো সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত থাকায় এই পথে যান চলাচল ব্যাহত হতো এবং খাল পারাপারে চরম বিপাকে পড়তে হতো মানুষকে। এখন খুব সহজেই স্থানীয়দের উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে, যা পুরো অঞ্চলের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক হাওয়া বইয়ে দিচ্ছে।
রূপ নিচ্ছে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে
বিকেল গড়ালেই সেতুর ওপর সমাগম ঘটে সর্বস্তরের মানুষের। স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ লিটন ও রফিকুল ইসলাম জানান, আগে এই খাল পার হতে ব্যাপক কষ্ট হতো, যা নতুন সেতুর মাধ্যমে সম্পূর্ণ কেটে গেছে। সেতুটি দেখতে দেখতে চমৎকার হওয়ায় এখন বিকেল বেলা পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে অনেকে সময় কাটাতে আসেন। দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য এখানে লাইটিং, বসার ব্যবস্থা ও অতিরিক্ত সৌন্দর্যবর্ধন করা হলে এটি পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করবে বলে মনে করেন ঘুরে দেখতে আসা দর্শনার্থী সরদার সোহেল।
বরিশাল এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আল ইমরান জানান, আধুনিক প্রকৌশল ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ে বরিশাল বিভাগের গৌরনদী ও উজিরপুর উপজেলায় এমন দুটি আর্চ ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। হাতিরঝিলের আদলে তৈরি এসব অবকাঠামো দেখতে এখন প্রতিদিনই প্রচুর দর্শনার্থী আসছেন।

