রক্তে লেখা ১৮ ডিসেম্বর: হাদি আর নেই, শুধু প্রতিশোধের বারুদ জ্বলে আছে

শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

আজ ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে সিঙ্গাপুর থেকে ভেসে এলো সেই সংবাদ, যার ভয়ে গত ছয়টি দিন ধরে থমকে ছিল পুরো বাংলাদেশ । শরিফ ওসমান হাদি আর নেই। জুলাই বিপ্লবের সেই গর্জন, ইনকিলাব মঞ্চের সেই অকুতোভয় কণ্ঠস্বর চিরতরের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেছে । সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউতে জীবন-মৃত্যুর এক অসম লড়াই শেষে তিনি শাহাদাত বরণ করেছেন 

এটি কেবল একটি মৃত্যুসংবাদ নয়; এটি ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই বদ্বীপের হৃদপিণ্ডে বিঁধ করা এক বিষাক্ত ফলা 

অশ্রু এখন আর জল নয়, লাভাস্রোত

কান্না করার সময় শেষ হয়ে গেছে। হাদির এই চলে যাওয়া কোনো সাধারণ প্রস্থান নয়। এটি জুলাই বিপ্লবের চেতনার ওপর এক নিষ্ঠুর কুঠারাঘাত । যে মস্তিষ্ক দিনরাত ভাবত দেশের সার্বভৌমত্বের কথা, ফ্যাসিবাদের শেকড় উপড়ে ফেলার কথা—ঘাতকের বুলেট সেই মস্তিষ্ককেই ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে 

আজ বাংলাদেশের প্রতিটি ধূলিকণা সাক্ষী, হাদির শরীর থেকে ঝরা রক্ত কেবল পিচঢালা পথ ভেজায়নি, ভিজিয়েছে কোটি তরুণের চোখ। কিন্তু সাবধান! এই চোখের জল দুর্বলতার নয়। প্রতিটি অশ্রুবিন্দু আজ একেকটি বুলেটের মতো ভারী, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে মিশে আছে বিশ্বাসঘাতকদের টুঁটি চেপে ধরার হুঙ্কার 

বিজয়নগরের সেই অভিশপ্ত দুপুর

দিনটি ছিল ১২ ডিসেম্বর, পবিত্র জুমাবার। বিজয়নগরের রাজপথে রিক্সায় করে যাচ্ছিলেন হাদি । ঘাতকরা জানত, সামনাসামনি লড়াইয়ে হাদিকে হারানো অসম্ভব। তাই কাপুরুষের মতো হেলমেট পরে, মোটরসাইকেলে এসে খুব কাছ থেকে তার মাথায় গুলি চালায় তারা 

রক্তে ভেসে যায় রিক্সার পাদানিতে লুটিয়ে পড়া হাদির দেহ । ভাবুন সেই মুহূর্তের কথা—যিনি নিজের জীবন তুচ্ছ করে স্বৈরাচার হটিয়েছিলেন, স্বাধীন দেশে তাকেই দিনের আলোতে গুলি খেতে হলো! এর চেয়ে বড় লজ্জা, এর চেয়ে বড় ঘৃণা আর কী হতে পারে?

ষড়যন্ত্রের নীল নকশা: দিল্লি টু ঢাকা

হাদির অপরাধ কী ছিল? তিনি ভারতী আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন? তিনি ‘অখণ্ডতা’র প্রশ্নে আপোষ করেননি? । মৃত্যুর মাত্র দুদিন আগে তিনি ফেসবুকে লিখেছিলেন, ভারতীয় নম্বর থেকে তাকে ক্রমাগত হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে । তারা বলেছিল, হাদির মা-বোনকে ধর্ষণ করবে, তাকে হত্যা করবে 

আজ সেই হুমকিই সত্য হলো। সাবেক স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ভারতে বসে বিপ্লবীদের হত্যার যে ছক কষেছেন, হাদি তার প্রথম বলি । পুলিশের তদন্ত বলছে, শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগীরা ঘটনার পরপরই ময়মনসিংহ সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছে । প্রশ্ন জাগে: সীমান্তে এত কড়াকড়ি থাকার পরও খুনিরা পালায় কী করে? তবে কি রক্ষকই আজ ভক্ষক? ভারত কি আজ খুনিদের অভয়ারণ্য? ।

চিকিৎসা নয়, যেন এক প্রহসন

হাদি যখন ঢাকা মেডিকেলে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিলেন, তখন তাকে বিদেশে পাঠাতে কেন ৭২ ঘণ্টা সময় লাগলো? । মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ যখন বাড়ছিল, তখন প্রতিটি সেকেন্ড ছিল হাদির জীবনের সমান । এই প্রশাসনিক ব্যর্থতা, এই অবহেলা—এর দায় কে নেবে? নাকি প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসররাই চায়নি হাদি বেঁচে ফিরুক? 

স্লোগান একটাই: “দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা ঢাকা”

হাদির মৃত্যু আমাদের কাঁদিয়েছে সত্য, কিন্তু এই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে । আজ ইনকিলাব মঞ্চের স্লোগান—”আগামীকাল বিজয় দিবসে আমরা উৎসবে যাব না, আমরা প্রতিরোধে যাব” 

ছাত্র-জনতা আজ রাজপথে। তাদের মুখে একটাই কথা—“আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে?” । এই আগুন আর নিভবে না। যতদিন পর্যন্ত হাদির খুনিদের এবং তাদের পেছনের ভারতীয় মাস্টারমাইন্ডদের বিচার না হবে, ততদিন এই বাংলা শান্ত হবে না 

শেষ কথা: প্রতিশোধের ডাক

শরিফ ওসমান হাদি, তুমি শান্তিতে ঘুমাও। তোমার বৃদ্ধ মা, তোমার শোকার্ত পরিবার আজ একা নয় । তুমি ছিলে একটি স্ফুলিঙ্গ, ঘাতকরা তোমাকে নিভিয়ে দিয়ে পুরো বাংলাদেশে দাবানল জ্বালিয়ে দিয়েছে 

তোমার রক্ত বৃথা যেতে দেব না। এই কান্না বারুদের মতো জ্বলে উঠবে । প্রতিশোধের আগুনে পুড়ে ছাই হবে সব ষড়যন্ত্র, সব অন্যায়। বিদায় কমরেড, লাল সালাম!

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *