ইন্দোনেশিয়া সফর: নীল অর্থনীতির পাঠ ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা

ড. মো. শরীফুল ইসলাম

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা’র (FAO) আমন্ত্রণে জাকার্তা ও বালির সফর আমার কাছে কেবল একটি আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ছিল না—এটি ছিল ইতিহাস, অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের এক সমন্বিত পাঠ। ইন্দোনেশিয়া আজ যে “ব্লু ইকোনমি” বা নীল অর্থনীতির পথে এগোচ্ছে, তা আমাদের বাংলাদেশের জন্যও এক মূল্যবান দিকনির্দেশনা হতে পারে।

ঔপনিবেশিক অতীত থেকে আত্মনির্ভরতার শিক্ষা

১৭শ শতাব্দী থেকে ডাচ উপনিবেশবাদীরা এই অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণে এনেছিল। দীর্ঘ ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা ইন্দোনেশিয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে—নিজস্ব সম্পদ, বিশেষ করে সামুদ্রিক সম্পদের ওপর সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। ১৯৪৯ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশটি সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির শক্তিতে নতুন পরিচয় গড়ে তুলেছে।

জাকার্তা ও বালি: নীতিনির্ধারণ ও পরিবেশের মেলবন্ধন

জাকার্তায় আমি লক্ষ্য করেছি কীভাবে সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাত একত্রে কাজ করছে। ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে তাদের সামুদ্রিক ও মৎস্য খাতে বিনিয়োগ প্রায় ২.৩৮ ট্রিলিয়ন ইন্দোনেশীয় রুপীতে পৌঁছেছে।

অন্যদিকে বালি যেন প্রকৃতি ও অর্থনীতির এক নিখুঁত সংমিশ্রণ। পর্যটন, মৎস্য, প্রবাল প্রাচীর সংরক্ষণ—সবকিছু মিলিয়ে এক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের উদাহরণ। এখানে “উন্নয়ন বনাম পরিবেশ” নয়, বরং “উন্নয়ন সহ পরিবেশ”—এই ধারণাটিই কার্যকর।

বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার দিগন্ত

বঙ্গোপসাগর আমাদের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দ্বার খুলে রেখেছে। ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য তিনটি প্রধান শিক্ষা রয়েছে:

  • মৎস্য খাত: স্টক মূল্যায়ন, কোটা নির্ধারণ এবং ট্রেসেবিলিটি সিস্টেম চালু করা। এতে উৎপাদন ও রপ্তানি—উভয়ই বাড়বে।
  • পরিবেশবান্ধব পর্যটন: বালির মতো করে কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন বা সুন্দরবনকে পরিকল্পিত ও পরিবেশ রক্ষা করে উন্নয়ন করা।
  • বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্ব: পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেলের মাধ্যমে সামুদ্রিক অবকাঠামো ও প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিতে বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।

উপসংহার: সমুদ্রের ঢেউয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু নদী বা ভূমিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর একটি বড় অংশ লুকিয়ে আছে আমাদের সমুদ্রে। ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাস আমাদের শেখায়—সঠিক নীতি ও পরিকল্পনা থাকলে একটি দেশ তার প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে। যদি আমরা নীল অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিই, তবে বাংলাদেশও একদিন দক্ষিণ এশিয়ার একটি শক্তিশালী সামুদ্রিক অর্থনীতিতে পরিণত হবে।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *