কুড়িগ্রামের গ্রামে গড়ে উঠেছে দুর্লভ ‘বঙ্গভাষা লেখক জাদুঘর’; সংরক্ষণে সরকারি সহায়তার দাবি

মোস্তাফিজার রহমান জাহাঙ্গীর, কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি

শতবর্ষ আগের বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত ও দুর্লভ সাময়িকী—‘বঙ্গদর্শন’, ‘সবুজ পত্র’, ‘প্রবাসী’, ‘শনিবারের চিঠি’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘বঙ্গশ্রী’, ‘যমুনা’ কিংবা ‘মাসিক মোহাম্মদী’। যেসব পত্রিকা সিংহভাগ মানুষ কেবল সাহিত্যের ইতিহাসেই পড়েছে, সেগুলোর দুর্লভ মূল কপিগুলো এখন এক পলকে দেখার সুযোগ মিলছে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার উত্তর বড়ভিটা গ্রামে। সেখানেই নিভৃত পল্লীতে গড়ে উঠেছে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অনন্য সংগ্রহশালা ‘বঙ্গভাষা লেখক জাদুঘর’।

পুরস্কারের অর্থ ও ব্যক্তিগত কষ্টে গড়ে তোলা স্বপ্ন

​এই জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা স্থানীয় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলা বিষয়ের শিক্ষক, শিশুসাহিত্যিক ও গীতিকার তৌহিদ-উল ইসলাম। বইপড়ার অভ্যাস ছড়িয়ে দিতে ২০১০ সালে তিনি প্রথম প্রতিষ্ঠা করেন ‘রংধনু পাঠাগার’। নানা প্রতিকূলতার পরও দমে না গিয়ে নিজ বাড়ির পাশে নতুন করে পাঠাগার গড়ে তোলেন এবং বিদ্যানিকেতনের লাইব্রেরীকেও সমৃদ্ধ করেন।

​শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২২ সালে তিনি লাভ করেন ‘আইপিডিসি-প্রথম আলো প্রিয় শিক্ষক সম্মাননা’। সম্মাননার দুই লাখ টাকা এবং নিজের সঞ্চিত আরও কয়েক লাখ টাকা ব্যয়ে তিনি এ জাদুঘরটি নির্মাণ করেন। ২০২৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর প্রখ্যাত কথাশিল্পী আনোয়ারা সৈয়দ হক আনুষ্ঠানিকভাবে জাদুঘরটির উদ্বোধন করেন।

কী আছে এই জাদুঘরে?

​বর্তমানে জাদুঘরের গ্যালারিতে সংরক্ষিত রয়েছে:

  • দুর্লভ সংকলন: ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের শত শত সাময়িকী, শতবর্ষ পুরোনো বই এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয় ও আদর্শলিপির কপি।
  • প্রাচীন পুঁথি: তালপাতা, গাছের বাকল ও তুলোট কাগজে লিখিত প্রাচীন পুঁথিসমগ্র।
  • ইতিহাসের দলিল: ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ, ১৯৭০ সালের নির্বাচন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ এবং ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা।
  • সাংস্কৃতিক স্মারক: ভাষা আন্দোলনের দুর্লভ আলোকচিত্র, ভাষাসৈনিকদের ছবি, পাকিস্তান আমলের কলের গান (গ্রামোফোন) ও রেকর্ড, পুরোনো বাংলা ক্যালেন্ডার এবং বাংলা ভাষার দুই শতাধিক কবি-সাহিত্যিকের প্রতিকৃতি ও তথ্য।

সাংস্কৃতিক বিস্তার ও ট্রাস্ট গঠন

​জাদুঘরের পাশাপাশি তৌহিদ-উল ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘জলেশ্বরী কালচারাল ক্লাব’ ও একটি আধুনিক উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক মঞ্চ। এ ছাড়া শিশুসাহিত্যের বিকাশে ২০২১ সাল থেকে নিজ অর্থায়নে ২০ হাজার টাকা অর্থমূল্যের ‘সৈয়দ শামসুল হক শিশুসাহিত্য পুরস্কার’ এবং গত এক দশক ধরে গুণীজন সম্মাননা প্রদান করে আসছেন তিনি।

​এসব উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সম্প্রতি গঠিত হয়েছে ‘সংস্কৃতি কল্যাণ ট্রাস্ট’। ট্রাস্টের চেয়ারম্যান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ভূপতি ভূষণ বর্মা জানান, বর্তমানে একটি আধাপাকা টিনশেড ভবনের পাঁচটি গ্যালারিতে জাদুঘরের কাজ চলছে। তবে স্থান সংকটের কারণে সংগৃহীত বহুগুণ মূল্যবান স্মারক সাধারণের জন্য প্রদর্শন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই এখানে একটি বড় স্থায়ী ভবন নির্মাণ সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

​ট্রাস্টের অন্যতম ট্রাস্টি ও সাংবাদিক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রতিষ্ঠাতা তৌহিদ-উল ইসলাম সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায় এই বিশাল কার্যক্রম চালিয়ে নিচ্ছেন। এমনকি চাকরিজীবন শেষে ট্রাস্টের ফান্ডে তিনি আরও ১০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে উত্তরাঞ্চলের এই অনন্য জাতীয় ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় একটি আধুনিক ভবন নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *