বিচারকের আসনে বসে হাইকোর্ট অবমাননা ও বিচারিক অসদাচরণের আড়ালে কী ঘটেছিল?
শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

বিচার বিভাগের যে অংশে অসদাচরণ ও বেআইনি সিদ্ধান্তের কারণে এতদিন সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা ক্ষুণ্ন হচ্ছিল, আজ আইনের কঠোর প্রয়োগে সেই অপশক্তিগুলো পদে পদে চিহ্নিত হতে শুরু করেছে। বিচারালয়ে শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এই সময়ে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (১ম আদালত)-এর বিচারক মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদের একটি আদেশের গুরুত্ব ও তার আইনি অপরাধের ওজন কোনো সাধারণ বিষয় নয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের দেওয়া নির্দেশাবলী অধীনস্থ সকল নিম্ন আদালতের জন্য কঠোরভাবে বাধ্যতামূলক (Mandatory)! উপরন্তু, “বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা” এবং ‘আদালত অবমাননা আইন (Contempt of Courts Act)’ অনুযায়ী—উচ্চ আদালতের আদেশ জানার পরও যদি কোনো নিম্ন আদালতের বিচারক তা ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা বা অমান্য করেন, তবে তা কেবল আইনি ভুল নয়; বরং তা সরাসরি ‘গুরুতর বিচারিক অসদাচরণ’ (Gross Misconduct) এবং সর্বোচ্চ আদালতকে সরাসরি অবমাননা করার মতো গুরুতর আইনি অপরাধ। বিচারকের চেয়ারে বসে উচ্চ আদালতের আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো মানে আইনের সার্বভৌমত্বকেই চ্যালেঞ্জ করা।
সাধারণ মানুষের ভাষায়:
ময়মনসিংহ আদালতে সেদিন প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল?
সাধারণ মানুষের বোঝার সুবিধার্থে পুরো ঘটনাটি সহজভাবে দেখলে থমকে যেতে হয়। একটি জমি সংক্রান্ত বিরোধে মূল দেওয়ানি মামলাটি (Suit No. 22 of 2005) প্রথমে করেছিলেন আ: খালেক মাস্টার। ২০১৪ সালে আ: খালেক মাস্টার মৃত্যুবরণ করার পর তাঁর ওয়ারিশ হিসেবে মামলাটিতে স্থলাভিষিক্ত হন তাঁর স্ত্রী খোদেজা বেগম এবং ২য় পুত্র কামরুজ্জামানসহ অন্যান্যরা। পরবর্তীতে এই মূল দেওয়ানি মামলা এবং আপিল মামলায় (অন্য আপিল নং ২০৪/২০১১) এক ভয়াবহ জালিয়াতির চিত্র উঠে আসে। জালিয়াতি উন্মোচিত হওয়ার পর প্রকৃত ওয়ারিশ ৩য় পক্ষ হিসেবে স্নেহাশীষ ঘোষ মিশু মামলায় অন্তর্ভুক্ত হন। ন্যায়বিচারের স্বার্থে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের বিজ্ঞ বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী Civil Revision No. 6564 of 2023-এ অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও আইনি বাধ্যবাধকতাপূর্ণ আদেশ দেন—৩য় পক্ষ স্নেহাশীষ ঘোষ মিশুকে পক্ষভুক্ত রেখেই পরবর্তী ৪ মাসের মধ্যে আপিলটি দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। আইন অনুযায়ী এটি মানা বিচারক মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদের জন্য আইনগত ‘ফরজ’ ছিল। কিন্তু গত ২৬.০৮.২০২৫ তারিখে ১২২ নম্বর আদেশে তিনি হাইকোর্টের সেই সুনির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক নির্দেশকে পুরোপুরি তোয়াক্কা না করে, বাদীপক্ষের মূল মামলা ও আপিল একযোগে প্রত্যাহারের (Withdrawal) আবেদন মঞ্জুর করে বসেন। সহজ কথায়, হাইকোর্ট যেখানে জালিয়াতির বিচার ৪ মাসের মধ্যে শেষ করতে বলেছিলেন, সেখানে নিম্ন আদালতের এই বিচারক এক কলমের খোঁচায় পুরো মামনাটাই ধামাচাপা দিয়ে জালিয়াতিকে স্থায়ী স্বীকৃতি দেওয়ার পথ সহজ করে দিলেন!
জালিয়াতি ঢাকা ও আইনের শাসন ধূলিস্যাৎ করার অপচেষ্টা
বিচারক হারুন-অর-রশীদের এই বিতর্কিত ও বেআইনি সিদ্ধান্তের মূল শিকার হয়েছেন একজন নিঃস্ব ওয়ারিশ এবং দেশের বিচারব্যবস্থা:
- প্রমাণিত জালিয়াতির দলিল আড়াল: নিম্ন আদালতে যে জালিয়াতি প্রমাণিত বা ধরা পড়েছিল, মূল মামলা ও আপিল তুলে নেওয়ার অনুমতি দেওয়ায় সেই জালিয়াতির রায় ও বিচারিক নথি আদালতের ফাইল থেকে চিরতরে আড়াল করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হলো।
- প্রকৃত ওয়ারিশের দরজায় তালা: ৩য় পক্ষ হিসেবে আইনি লড়াই চালানো মূল ওয়ারিশ স্নেহাশীষ ঘোষ মিশুর ন্যায়বিচার পাওয়ার শেষ আশাটুকু এক আদেশে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
হাইকোর্টের কঠোর চাবুক ও অসৎ চক্রের মুখোশ উন্মোচন
অধীনস্থ বিচারকের এমন নজিরবিহীন ও বেআইনি পদক্ষেপ জানতে পেরে মহামান্য হাইকোর্ট ক্ষুব্ধ হন। উচ্চ আদালতকে অবমাননা করে জালিয়াতিকে সুরক্ষার এই চক্রান্ত রুখে দিতে হাইকোর্ট বিভাগ কালবিলম্ব না করে বিচারক মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদের ওই ২৬/০৮/২০২৫ তারিখের আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেছেন।
আজ ময়মনসিংহের আইনজীবীদের এজলাস থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্টের বিচারাঙ্গনে এই ঘটনাটি নিয়ে তোলপাড় চলছে। বিজ্ঞ আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারকের আসনে বসে যারা আইন ও উচ্চ আদালতকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জালিয়াতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার সাহস দেখান, তাদের চিহ্নিত করার সময় এসেছে। হাইকোর্টের এই কঠোর অবস্থান প্রমাণ করে যে, দেশে ন্যায়বিচার আবার মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে এবং বিচারকের পোশাকেও কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।





