বাংলাদেশ

সরকারি হাসপাতালের পাশে ক্লিনিকের বাজার বন্ধ হোক

f X

শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন কোনো বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনুমোদন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্বাস্থ্য খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ। এর সঙ্গে ওই এলাকার বিদ্যমান বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধের নির্দেশ যুক্ত হওয়ায় সিদ্ধান্তটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

প্রশ্ন হলো, এই নির্দেশনা কাগজে থাকবে, নাকি হাসপাতালের গেট থেকে এক কিলোমিটার বাস্তবেও এর প্রয়োগ দেখা যাবে?

বাংলাদেশের বহু শহরে সরকারি হাসপাতালের চারপাশে বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। রোগী সরকারি হাসপাতালে গেলেন, কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ কিংবা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনে তাকে হাসপাতালের আশপাশের কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে বলা হলো। স্বাস্থ্যসেবার এই বাস্তবতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন আছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের মান যাচাই করে মানসম্মত সেবা দিতে ব্যর্থ হলে অনুমোদন বাতিলের কথাও জানিয়েছেন। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো প্রয়োগ।

👉 স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন

নতুন অনুমোদন বন্ধ করা তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স, অবকাঠামো, জনবল, চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ, ল্যাবরেটরি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং রোগীর নিরাপত্তা বাস্তবে কতটা মানা হচ্ছে, সেটিই হবে প্রশাসনের আসল পরীক্ষা।

আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক যদি একই হাসপাতালের কাছাকাছি কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখেন, তাহলে সরকারি চিকিৎসাসেবা ও বেসরকারি বাণিজ্যিক সেবার মধ্যে স্বার্থসংঘাতের প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থাকা নিজেই অপরাধ নয়। মানুষের চিকিৎসার প্রয়োজন মেটাতে মানসম্মত বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের প্রয়োজন রয়েছে। সমস্যা তখনই, যখন অনুমোদন, মান নিয়ন্ত্রণ ও রোগীর নিরাপত্তার চেয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থ বড় হয়ে যায়।

তাই প্রশ্ন কোনো একটি ক্লিনিক বা হাসপাতালের বিরুদ্ধে নয়। প্রশ্ন পুরো ব্যবস্থার কাছে: কোন প্রতিষ্ঠান বৈধ? কোন প্রতিষ্ঠান মানসম্মত? কোনটির লাইসেন্স হালনাগাদ? কোন প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত জনবল আছে? কোথায় সরকারি চিকিৎসক প্রাইভেট প্র্যাকটিস করছেন? আর কোথায় রোগীর প্রয়োজনকে ব্যবসায়িক স্বার্থের কাছে ছোট করা হচ্ছে?

ময়মনসিংহের মতো দ্রুত সম্প্রসারিত শহরে এই প্রশ্নগুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। সরকারি হাসপাতালের চারপাশের এক কিলোমিটার এলাকা যদি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রিত করা যায়, তাহলে এটি শুধু নতুন ক্লিনিকের অনুমোদন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত থাকবে না। এটি সরকারি হাসপাতালকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠনের একটি সুযোগ হতে পারে।

কাগজে নিষেধাজ্ঞা নয়, মাঠে দৃশ্যমান প্রয়োগ চাই।

এখন দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে এক কিলোমিটার এলাকার একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন। সেখানে কোন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে, তাদের অনুমোদনের অবস্থা কী এবং তারা নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করছে কি না, তা প্রকাশ্য যাচাইয়ের আওতায় আনা উচিত।

কারণ স্বাস্থ্যসেবায় জবাবদিহি কোনো বিলাসিতা নয়। এটি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্ন।

ময়মনসিংহের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন তুলে আসা একজন সাংবাদিক হিসেবে আমার অবস্থান পরিষ্কার: এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন আমরা দেখতে পাব অনুমোদন আছে বলে কোনো প্রতিষ্ঠান ছাড় পাচ্ছে না, আর প্রভাবশালী বলে কেউ আইনের বাইরে থাকছে না।

সরকার যদি সত্যিই স্বাস্থ্য খাতে কঠোর অবস্থান নেয়, তাহলে এখন সময় সেই কঠোরতার বাস্তব প্রয়োগ দেখানোর।

সরকারি হাসপাতাল জনগণের। স্বাস্থ্যসেবা জনগণের অধিকার। কোনো অনিয়মিত বাণিজ্যিক ব্যবস্থার কাছে সেই অধিকার জিম্মি হতে পারে না।