পারিবারিক ইমোশনাল ট্যাক্স

অর্থের চাদরে মোড়ানো আত্মীয়-স্বজন: পর্ব-০১

শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

টাকাই যখন একজন মানুষের অস্তিত্বের দাম, রক্তের সম্পর্কগুলো যখন কেবলই অর্থের দাঁড়িপাল্লায় মাপা হতে থাকে, তখন নিঃশর্ত ভালোবাসার মৃত্যু ঘটে খুব নীরবে। আমাদের চারপাশের চেনা পরিবারগুলোতে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা রক্তমাংসের মানুষ নন, আপনজনদের কাছে তারা যেন কেবলই একটি ‘টাকা বানানোর কল’। তাদের নিজস্ব কোনো ক্লান্তি থাকতে নেই, থাকতে নেই জমানো অভিমান কিংবা নিজের জন্য একচিলতে স্বপ্ন দেখার অধিকার। একজনকে নিংড়ে, তার স্বপ্নগুলোকে চুষে খেয়ে বাকিদের এই যে অলস ও বিলাসী বেঁচে থাকা—এ এক অদ্ভুত পারিবারিক পঙ্গুত্ব। সম্পর্কের চাদরে মোড়ানো ভালোবাসার আড়ালে এই অধিকারবোধ কখন যে নিছক লোভে পরিণত হয়, তা ভুক্তভোগী নিজে টের পাওয়ার আগেই ভেতর থেকে নিঃস্ব হয়ে যান।

মধ্যবিত্তের ‘বলির পাঁঠা’ ও স্বপ্নের অপমৃত্যু

মধ্যবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের দিকে তাকালে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। যে তরুণ বা তরুণীটি পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস, তার নিজের বয়সের কোনো বসন্ত থাকে না। “ছোটবেলা থেকে খাইয়ে-পরিয়ে বড় করেছি”—এই খোঁটা আর ‘রক্তের সম্পর্কের’ দোহাই দিয়ে তাদের কাঁধে আজীবন চাপিয়ে দেওয়া হয় এক অদৃশ্য ‘ইমোশনাল ট্যাক্স’। পরিবারের হাল ধরতে গিয়ে নিজের জীবনের ছোট ছোট শখ, প্রেম, কিংবা নিজের একটি সংসার পাতার স্বপ্ন—সবকিছুই তারা নিজের হাতে গলা টিপে হত্যা করে। আজীবন তারা হয়ে থাকে এক করুণ ‘বলির পাঁঠা’। দিনশেষে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরে যখন তারা দেখে আপনজনদের প্রত্যাশার পারদ কেবলই ঊর্ধ্বমুখী, তখন এই মানুষগুলো ডুকরে কেঁদে ওঠে। তারা বুঝতে পারে—এই ঘরে তার নিজের কোনো জায়গা নেই, জায়গা আছে কেবল তার উপার্জিত অর্থের।

রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের শূন্য হাতের ট্র্যাজেডি

চোখের জল আর বুকের ঘাম যেখানে একাকার হয়ে যায়, তার নাম প্রবাস। উদয়াস্ত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে, নিজের সাধ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে যে রেমিট্যান্স যোদ্ধা মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি থেকে দেশে টাকা পাঠান, সেই টাকায় দেশে ভাই-বোনের বিয়ে হয়, ওঠে সুরম্য অট্টালিকা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই মানুষটি যখন অসুস্থ হয়ে, যৌবন হারিয়ে শূন্য হাতে আপন ঠিকানায় ফিরে আসেন, তখন নিজ ঘরেই তিনি হয়ে যান এক অবাঞ্ছিত ‘বোঝা’। স্ত্রী, সন্তান কিংবা বাবা-মা—যাদের জন্য সে নিজের জীবনটাকে তিলে তিলে শেষ করেছে, তাদের কাছেই সে হয়ে ওঠে চরম অবহেলার পাত্র। কারণ, নির্মম হলেও সত্য, পরিবারটি মানুষটার সেই হাড়ভাঙা ত্যাগকে ভালোবাসেনি, ভালোবেসেছিল মাস শেষে পাঠানো টাকার অঙ্কটিকে।

রূপালি পর্দার জৌলুসে পরজীবী আত্মীয়দের থাবা

এই শোষণের আগুন থেকে রেহাই পায় না জৌলুসে মোড়া রূপালি পর্দার তারকারাও। ক্যারিয়ারের সুদিনে যে পরিবার তারকাদের কেবল ‘টাকা ছাপানোর মেশিন’ বানিয়েছে, তারাই একসময় কষ্টার্জিত সম্পদ আত্মসাতে মত্ত হয়। প্রখ্যাত লোকসঙ্গীত শিল্পী থেকে শুরু করে বহু গুণী অভিনয়শিল্পী জীবনের সায়াহ্নে এসে ধুঁকে ধুঁকে মরেছেন। কারণ তাদের জীবনের সোনালি দিনগুলোর সমস্ত উপার্জন চলে গেছে অর্থের চাদরে মোড়ানো এই পরজীবী আত্মীয়দের পকেটে। যখন নিংড়ানোর মতো আর এক ফোঁটা রসও অবশিষ্ট থাকে না, তখন তথাকথিত সেই ‘আপনজনেরাই‘ তাদের আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলতে একটুও কাঁপে না।

মানুষের মূল্যায়ন হোক, মানিব্যাগের নয়

দিনশেষে, যে মানুষটি সবার জন্য নিজের সবটুকু বিলিয়ে দেয়, পৃথিবীর বুকে তার চেয়ে একাকী, তার চেয়ে নিঃস্ব আর কেউ নেই। বুকভরা অভিমান নিয়ে তারা হয়তো একদিন চিরতরে হারিয়ে যায়, আর পেছনে রেখে যায় শুধু তাদের উপার্জনে গড়ে ওঠা ইটের দেয়াল। আমাদের বুঝতে হবে, যে মানুষটি পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে নিজের হাসিটুকু চিরতরে ভুলে গেছে, তারও একটু আশ্রয়ের প্রয়োজন, তারও বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার অধিকার রয়েছে। আসুন, আমরা ভালোবাসতে শিখি মানুষটাকে, তার মানিব্যাগটাকে নয়। তা না হলে, একদিন এই পৃথিবীতে কেবল টাকার হিসাবটাই রয়ে যাবে, চিরতরে হারিয়ে যাবে মায়া, মমতা আর ‘আপন‘ শব্দের পবিত্রতা।

About The Author

One thought on “পারিবারিক ইমোশনাল ট্যাক্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *