আত্মসিদ্ধান্ত যদি অন্যের ক্ষতির স্বার্থে না হয়, তা অবশ্যই খোদার নির্দেশ

শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

নিজের জীবনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে জড়িয়ে থাকে একজন মানুষের দীর্ঘ পথচলার গল্প। যখন আপনার নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তে অন্য কারো ক্ষতি করার বা কাউকে ছোট করার কোনো উদ্দেশ্য থাকে না, তখন সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকাটা কোনো অহংকার নয়—তা হলো আপনার আত্মিক শক্তি। তবে মানুষ সামাজিক জীব হওয়ায়, এই শক্তির প্রকাশটা হতে হবে অত্যন্ত মার্জিত এবং কৌশলী, যাতে সমাজের সুসম্পর্কও নষ্ট না হয় আবার নিজের সিদ্ধান্তও অক্ষুণ্ণ থাকে।

সামাজিক বাস্তবতা এবং প্রকাশ্য বিরোধিতার ঝুঁকি

মানুষ সামাজিক জীব, তাই আমরা সমাজের একদম বাইরে গিয়ে বাঁচতে পারি না। যখন আমরা অন্যের সমালোচনা বা মন্তব্যকে প্রকাশ্যে ‘তুড়ি মেরে’ উড়িয়ে দিই, তখন তা সামাজিক পরিবেশকে উত্তপ্ত করে এবং মানুষের অহমে আঘাত লাগে। ফলে নতুন আরেকটি সমালোচনার ঝড় তৈরি হয়। বিজ্ঞতার পরিচয় হলো, কোলাহলকে কোলাহল দিয়ে না বাড়িয়ে, নীরবতার ঢাল দিয়ে তা সামলানো। প্রকাশ্য কোনো সংঘাত বা তর্কে না গিয়ে নিজের কাজটা নীরবে করে যাওয়াই হলো সামাজিক বুদ্ধিমানদের লক্ষণ।

কৌশলী নীরবতা: যেন মানুষ বুঝতে না পারে

নিজের সিদ্ধান্তের ওপর বলিষ্ঠ হওয়ার সবচেয়ে মার্জিত উপায় হলো—লড়াইটা বাইরে না দেখিয়ে নিজের ভেতরে রাখা। মুখে কোনো তর্কে না জড়িয়ে, বাহ্যিকভাবে সবার সাথে স্বভাবসুলভ সৌজন্যতা বজায় রেখে, কিন্তু অবচেতনে নিজের সিদ্ধান্তে ইস্পাতকঠিন থাকা।

শান্ত প্রতিক্রিয়া

চারপাশের মানুষেরা যখন হুট করে তাকিয়ে কোনো মন্তব্য করবে, তখন তা নিয়ে উত্তেজিত না হয়ে গুরুত্বের সাথে নেয়ার অভিনয়ে এড়িয়ে যাওয়া ভালো।

নীরব বাস্তবায়ন

মানুষ যেন বুঝতেই না পারে যে আপনি তাদের চিন্তাধারাকে আপনার জীবনের চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ করেননি। তারা ভাববে আপনি তাদের কথা শুনেছেন, অথচ দিনশেষে আপনি চলবেন আপনার গোটা বয়সের অভিজ্ঞতা দিয়ে গড়া খাঁটি পথেই।

গোটা জীবনের প্রজ্ঞা বনাম ক্ষণিকের মন্তব্য

আজ আপনি যে সিদ্ধান্তটি নিয়েছেন, তার পেছনে জড়িয়ে আছে আপনার গোটা বয়সের অভিজ্ঞতা – আপনার জীবনের প্রতিটি চড়াই-উতরাই ও দীর্ঘ পথচলার সঞ্চিত প্রজ্ঞা। অন্যদিকে, চারপাশের মানুষের মন্তব্যগুলো “যাহা হুট করে আপনার দিকে তাকিয়ে করা”!

যেহেতু তাদের মন্তব্যটি স্রেফ কয়েক সেকেন্ডের একটি অগভীর দৃষ্টিভঙ্গি, তাই আপনার প্রতিক্রিয়াও হওয়া উচিত একদম হালকা ও মৃদু। একে বড় কোনো ইস্যু না বানিয়ে এমন এক মনস্তাত্ত্বিক কৌশলে গ্রহণ করতে হবে, যেখানে আপনার ভেতরের স্বাধীনতাও ক্ষুণ্ণ হবে না, আবার সমাজও আপনার ওপর ক্ষিপ্ত হওয়ার সুযোগ পাবে না।

খোদার নির্দেশ ও সামাজিক সুসঙ্গতি

যখন আপনার সিদ্ধান্ত অন্যের অমঙ্গল চায় না, তখন খোদা আপনার অন্তরে যে শক্তি দেন, তা কোনো উগ্রতা বা ঔদ্ধত্য নয়; তা হলো এক শান্ত গভীরতা। এই শান্ত গভীরতাই একজন মানুষকে শেখায় কীভাবে সমাজে মিলেমিশে থেকেও নিজের ভেতরের ‘খোদ’ বা আত্মাকে স্বাধীন রাখা যায়। অন্যের সমালোচনাকে মনে জায়গা না দিয়ে, অথচ বাইরে এক চমৎকার সামাজিক ভারসাম্য বজায় রেখে নিজের সিদ্ধান্তকে সফল করাই হলো খোদার দেওয়া প্রকৃত প্রজ্ঞা।

চূড়ান্ত কথা:

আপনার সিদ্ধান্তটি আপনার গোটা জীবনের এক মহাকাব্য, আর অন্যের মন্তব্যটি কেবল এক পলকের এক লাইনের ভুল রিভিউ। মহাকাব্যের লেখক কখনো ভুল রিভিউয়ের সাথে প্রকাশ্যে ঝগড়া করেন না, তিনি স্রেফ হেসে তা এড়িয়ে যান এবং নিজের লেখা চালিয়ে যান। বিচলিত হবেন না; সামাজিক সৌজন্য বজায় রেখেই নিজের সিদ্ধান্তের ওপর নিঃশব্দে ও বলিষ্ঠভাবে এগিয়ে যান।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *