নদীপথে বরিশাল থেকে ভোলা: ছোট ছোট গল্পে দক্ষিণের জীবন: এম জসিম উদ্দিন।

নদীপথে ছুটে চলা ছোট ট্রলার। অনেকেই ভোলা–বরিশাল নৌপথে চলাচলের জন্য ট্রলার বেছে নেন। ফাইল ছবি :
সকাল থেকেই শরতের আকাশ যেন অভিমানী। ঘন মেঘে ঢাকা চারপাশ, ভ্যাপসা গরমে ভারী পরিবেশ। কীর্তনখোলা নদী তখন ভরা জোয়ারে টইটম্বুর, বুক চিরে ছোট ছোট ঢেউ এসে ভাঙছে বন্দরের পাড়ে। বরিশাল নদীবন্দরে একতলা ছোট ছোট লঞ্চের সারি। প্রতিটি লঞ্চে সকালের ব্যস্ততার শব্দ লেগে আছে। কোথাও বাজছে ভেঁপু, কোথাও মাইকে ভেসে আসছে পরিচিত ডাক, “যাঁরা ভোলা, মজুচৌধুরী যাবেন, তাঁরা দ্রুত আসুন, চলে আসুন, চালু চালু আসুন…”।
এই ডাক শোনামাত্রই যাত্রীরা হন্তদন্ত হয়ে লঞ্চে উঠে পড়ছেন। কেউ ওপর তলার প্রথম শ্রেণিতে, কেউবা নিচতলার তৃতীয় শ্রেণির বেঞ্চে জায়গা নিচ্ছেন। কেউ আবার নিচতলার সানকিন ডেকের বেঞ্চে গা এলিয়ে দিচ্ছেন।
রোববার সকাল তখন সাড়ে সাতটা। একে একে লঞ্চগুলো যাত্রীভর্তি হয়ে গন্তব্যের পথে যাত্রা শুরু করল। এমএল সোহেলি নামের লঞ্চটি ভোলার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করল কীর্তনখোলার বুক চিরে। নদীর বাতাস যাত্রীদের কিছুটা স্বস্তি দিতে শুরু করল।

লঞ্চের ওপর তলার যাত্রীরা যাত্রাপথে পরষ্পরের সঙ্গে নানা বিষয়ে আলাপ করেন
ছবি:
অন্যদের মতো আমরাও সেই যাত্রীদের দলে। আমাদের গন্তব্য দেশের একমাত্র দ্বীপ জেলা ভোলা। একসময় দক্ষিণের গ্রাম ও শহরের যোগাযোগের একমাত্র ভরসা ছিল এই ছোট লঞ্চগুলো। নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কাঠের তৈরি, পরে স্টিল বডির সানকিন ডেক লঞ্চ—সবই ছুটে বেড়াত নদীর বুক চিরে। সন্ধ্যা, বিষখালী, পায়রা, আগুনমুখা, কীর্তনখোলা, মেঘনা, তেঁতুলিয়া, কালাবদর—এসব নদ–নদী মুখর থাকত লঞ্চের শব্দে। ঘাটে ঘাটে ভেঁপুর আওয়াজে জমে উঠত জীবন। লঞ্চে থাকত কম দামি খাবারের পসরা। ফেরিওয়ালাদের হাঁকডাকে মুখর থাকত পরিবেশ, “অ্যাই রুডি-কেক”, “আমড়া খাইবেন, ঝাল-মসলা দিয়ে তৈরি আমড়া”, অথবা “এই বাদাম…বাদাম লাগবে…বাদাম”।
তবে এখন সময় বদলেছে। সেতু হয়েছে, ফেরিঘাট হয়েছে, সড়ক উন্নত হয়েছে। নদীপথের যাত্রী কমেছে, অনেক ছোট লঞ্চ আজ পরিত্যক্ত। ঘাটগুলো এখন অনেকটাই সুনসান, ভেঁপু বাজে না। তবু ভোলায় এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য এখনো বেঁচে আছে। এখানকার মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা—সবকিছুর জন্য এখনো লঞ্চই প্রধান ভরসা। বরিশাল থেকে আধা ঘণ্টা পরপর ভোলার ভেদুরিয়ার উদ্দেশে লঞ্চ ছেড়ে যায়। একই দূরত্বে ভেদুরিয়া থেকেও লঞ্চ আসে বরিশালে। বেশির ভাগই সানকিন ডেক লঞ্চ। ভেদুরিয়া ঘাটে পৌঁছাতে সময় লাগে সোয়া দুই ঘণ্টা।

লঞ্চের নিচতলার যাত্রীরা নিজেদের মতো আলাপে ব্যস্ত থাকেন
ছবি:
কীর্তনখোলা পার হয়ে লঞ্চ এমএল সোহেলি সরু বুখাইনগর নদ ধরে এগিয়ে চলে। এই নদের দুই পাড়ের জীবন যেন যাত্রীদের হাতছানি দেয়! কোথাও ধানখেত, কোথাও শিশুদের খেলা। মেঘে ঢাকা আকাশে আর টইটম্বুর নদীতে খেলা করে ছোট ছোট ঢেউ।
(https://biwta.gov.bd)
