​রাষ্ট্র যখন নিজেই চোর তৈরির ‘সুপার শপ’ খুলে বসে

আবু তারেক আনোয়ার খান

সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে, বিশ্ব রাজনীতির স্নায়ুকেন্দ্র যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বসে যখন মাতৃভূমির খবরের পাতার দিকে তাকাই, তখন লজ্জায়, ঘৃণায় এবং আতঙ্কে আমার সত্তা কেঁপে ওঠে। বাংলাদেশ পুলিশের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে সম্প্রতি লুণ্ঠিত এলএমজি (LMG) বা এসএমজি (SMG) ফেরত দিলে ৫ লাখ টাকা পুরস্কারের যে‘রেট চার্ট’ বা মূল্যতালিকা দেখলাম, তা কোনো সাধারণ বিজ্ঞপ্তি নয়। এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নৈতিক দেউলিয়াত্বের চূড়ান্ত দলিল। এটি প্রমাণ করে, আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র এখন ‘চোরের ওপর বাটপারি’র নীতিকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়েছে।

​আমার অনুজপ্রতিম সাংবাদিক ও দৈনিক জাহানের সম্পাদক শেখ মেহেদী হাসান নাদিম বিগত দিনে যে তিনটি কলাম লিখেছে, সেখানে সে রাষ্ট্রের এই নগ্ন রূপটি উন্মোচন করেছিল। নাদিমের সেই ‘স্বর্গের শর্টকাট’,অস্বচ্ছতার পেটিকোট’ আর ‘বিকাশের ৫ হাজার টাকার’ হাহাকারগুলো আজ আমাকে বাধ্য করেছে কলম ধরতে। আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে, পশ্চিমা আইনের শাসনের লেন্স দিয়ে আজ আমি বাংলাদেশের এই ‘লজ্জার বিজ্ঞপ্তি’র পূর্ণাঙ্গ ব্যবচ্ছেদ করতে চাই। এখানে কোনো ভান নেই, আজ কথা হবে নগ্ন সত্যে।

স্বর্গের ‘শর্টকাট’ বনাম চোরের ভিআইপি পাস

নাদিম তার লেখায় এক অসামান্য দার্শনিক উপমা দিয়েছিল। সারা জীবন সততার পথে চলে, কষ্ট করে স্বর্গের গেটে গিয়ে দেখলেন—আপনার বহু পেছনে বা নরকের সিরিয়ালে থাকার কথা ছিল যাদের, সেই সব চিহ্নিত পাপী ও চোরেরা আগেই স্বর্গের ভেতরে ঢুকে বসে আছে! কারণ? তারা মারা যাওয়ার আগে ঘুষ দিয়ে ‘ভিআইপি পাস’ বা ‘শর্টকাট’ কিনে নিয়েছিল।
​আজ বাংলাদেশ পুলিশ ঠিক সেই‘স্বর্গের শর্টকাট’ বাস্তবে রূপ দিয়েছে। ৫ আগস্টের পর যারা থানা লুট করল, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করল, তারা রাষ্ট্রদ্রোহী অপরাধী। অথচ রাষ্ট্র আজ তাদের বলছে— “তোমরা যদি অস্ত্রটা ফেরত দাও, তবে বিচার তো হবেই না, উল্টো ৫ লাখ টাকা বখশিশ পাবে!”

​এর মানে কী? এর মানে রাষ্ট্র ঘোষণা দিয়ে বলছে—বাংলাদেশে সততার কোনো দাম নেই। যে নাগরিক আইন মেনে চলে, রাষ্ট্র তাকে চেনে না। কিন্তু যে চোর বা সন্ত্রাসী রাষ্ট্রকে জিম্মি করতে পারে, রাষ্ট্র তাকেই সালাম ঠুকে টাকা দেয়। এটি কি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চুরির ইনসেনটিভ (Incentive) বা প্রণোদনা নয়? রাষ্ট্র কি নিজের অজান্তেই বলছে না— “চুরি করা ভালো, যদি ধরা না পড়ো, সরকারই তোমাকে দাম দেবে?”

‘সুপার শপ’-এর ডিসকাউন্ট অফার: রাষ্ট্র যখন পকেটমার

পুলিশের বিজ্ঞপ্তির দিকে তাকালে মনে হয় কোনো সুপার শপের ‘ক্লিয়ারেন্স সেল’ চলছে। পিস্তল ৫০ হাজার, রাইফেল ১ লাখ, আর সবার ওপরে এলএমজি ৫ লাখ!

​এই মূল্যতালিকা দেখে আমেরিকার কোনো পুলিশ অফিসার যদি প্রশ্ন করে— “তোমরা কি চোরদের কাছ থেকে অস্ত্র কিনছ?”—তবে লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাবে। এই পুরস্কারের ঘোষণা মূলত জাতিকে চোর বানানোর এক মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ।

​যুক্তি দিয়ে বুঝুন—পুলিশ বা আনসার বাহিনীর যে সদস্যের বেতন দিয়ে মাস চলে না, সে যখন দেখবে অস্ত্রটা ‘হারিয়ে গেছে’ বা ‘ছিনতাই হয়েছে’ বলে জিডি করে পরে নিজের শ্যালক বা বন্ধুকে দিয়ে জমা দিলেই ৫ লাখ টাকা পাওয়া যায়, সে কেন তা করবে না? রাষ্ট্র কি তবে নিজের পকেট কাটার জন্য নিজেই ব্লেড সরবরাহ করছে? আপনারা কি উৎপাদনশীলতাকে উৎসাহিত করছেন, নাকি সরকারি মাল চুরি করে ফেরত দেওয়ার ‘দালালি’কে পেশা বানাচ্ছেন?

আমেরিকার লেন্স: এলএমজি কেন থানায়?আমরা কি যুদ্ধক্ষেত্রে?

সভ্য বিশ্বের পুলিশিং ব্যবস্থার দিকে তাকান। আমি যে দেশে (যুক্তরাষ্ট্র) থাকি, এখানে ‘গান-কালচার’ প্রবল। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমেরিকার কোনো ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স, ছাত্র বিক্ষোভ বা সাধারণ দাঙ্গা দমনে পুলিশ এলএমজি (লাইট মেশিনগান) বা এসএমজি (সাব-মেশিনগান) ব্যবহার করে না। যুক্তরাজ্য, জাপান বা নরওয়েতে পুলিশ চলে লাঠি আর জনসম্পৃক্ততা দিয়ে। দাঙ্গা দমনে বিশ্বজুড়ে স্ট্যান্ডার্ড হলো টিয়ার শেল, জলকামান বা পেপার স্প্রে।
​সেখানে বাংলাদেশ পুলিশের অস্ত্রাগারে কেন যুদ্ধের অস্ত্র? এলএমজি বা চায়না রাইফেল ব্যবহার হয় সীমান্তে, ভিনদেশি শত্রুর মোকাবিলায়। ৫ আগস্টের আগে বর্ডার ক্রস করে কোনো ভিনদেশি বাহিনী তো বাংলাদেশ আক্রমণ করেনি। তবে কি রাষ্ট্র নিজ নাগরিকদেরই ‘শত্রু’ বা ‘যুদ্ধপক্ষ’ ঘোষণা করেছিল?

​নাদিমের প্রশ্নটিই আজ আমার প্রশ্ন— “কার হুকুমে বেরিয়েছিল এই মারণাস্ত্র?”
​জনগণের ট্যাক্সের টাকায় কেনা এই মেশিনগানগুলো কি নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার বুকে চালানোর জন্যই ভল্ট থেকে বের করা হয়েছিল? যদি তা না হয়, তবে সিভিল এরিয়ায় এই ভারী সমরাস্ত্রের উপস্থিতি কেন? এর উত্তর রাষ্ট্রকে দিতেই হবে।

৫ হাজার টাকার দীর্ঘশ্বাস বনাম ৫ লাখের ‘অস্বচ্ছ পেটিকোট’

​এই পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে জঘন্য দিকটি হলো—বৈষম্য। নাদিম তার লেখায় যে উদাহরণটি দিয়েছে, তা প্রতিটি সাধারণ মানুষের বুকের কান্না।
​বাংলাদেশে একজন রিকশাচালক বা দিনমজুর তার হাড়ভাঙা খাটুনির ৫০০০ টাকা গ্রামে মা-বাবার কাছে পাঠাতে গেলে বিকাশের দোকানে তাকে নিজের আইডি কার্ড দেখাতে হয়, তাকে জেরার মুখে পড়তে হয়। রাষ্ট্র সেখানে ১০ টাকার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মরিয়া।
​অথচ যে ব্যক্তি ৫ লাখ টাকার মরণাস্ত্র (এলএমজি) জমা দিতে আসবে, পুলিশ বিজ্ঞপ্তিতে বলে দিয়েছে— “তার পরিচয় গোপন রাখা হবে!”

​কী চমৎকার প্রহসন! গরিবের জন্য আইন, আর চোরের জন্য গোপনীয়তা? নাদিমের ভাষায়—এই গোপনীয়তা মূলত ‘অস্বচ্ছতার পেটিকোট’। এই পেটিকোটের আড়ালে মূলত দুর্নীতির মহোৎসব হবে। কে গ্যারান্টি দেবে যে, অস্ত্র উদ্ধারের নামে এই ৫ লাখ টাকা কোনো কাল্পনিক ‘মিস্টার এক্স’ বা কোনো মৃত ব্যক্তির নামে তুলে নিয়ে কোনো দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তার পকেটেই ঢুকবে না?
​যে দেশে মৃত মানুষ কবর থেকে উঠে ভোট দিতে পারে, সেখানে ৫ লাখ টাকার লোভে ‘কাল্পনিক চরিত্র’ তৈরি করা তো ডালভাত। আপনারা মূলত লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারের নামে রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুটের আরেকটা খাত তৈরি করছেন।

মাটি খুঁড়ে মেশিনগান নয়, হুকুমদাতাকে রিমান্ডে নিন

পুলিশ বলছে অস্ত্র ‘লুণ্ঠিত’ বা ‘হারানো’। আরে ভাই, থানার ভল্ট থেকে কি মেশিনগান একা একা হেঁটে বের হয়েছে? একটা সাধারণ কার্তুজ বের করতে গেলেও তো রেজিস্টার খাতায় এন্ট্রি লাগে, ডিউটি অফিসারের সই লাগে, ওসির অনুমতি লাগে। এলএমজি তো পকেটে করে ঘোরার বস্তু নয়।
​তবে কেন এই নাটক? নাদিম যথার্থই বলেছে—মাটি খুঁড়ে মেশিনগান বের করার দরকার নেই। যে অফিসারের হুকুমে ও স্বাক্ষরে সেদিন অস্ত্র বের হয়েছিল, তাকে রিমান্ডে নিন। তাকে জিজ্ঞেস করুন—কোন আইনের বলে সিভিল এরিয়ায় যুদ্ধের অস্ত্র নামিয়েছিলেন? কার নির্দেশে আর্মারি খালি করা হয়েছিল?
​আপনারা হুকুমদাতাদের বাঁচানোর জন্য, তাদের পাপ ঢাকার জন্য এখন জনগণের টাকায় পুরস্কারের নাটক সাজাচ্ছেন। অথচ তাদেরই উচিত ছিল আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কৈফিয়ত দেওয়া।

শহীদের রক্তের দাম ও ইজারাতন্ত্রের অবসান

সবচেয়ে বড় এবং নীতিগত প্রশ্ন—টাকাটা কার? এই ৫ লাখ টাকা কি পুলিশের আইজিপি বা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পকেট থেকে যাবে? না। এটি যাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। অর্থাৎ আমার, আপনার, সেই রিকশাচালকের ট্যাক্সের টাকা।
​নাদিমের জবানবন্দিই আজ ১৬ কোটি মানুষের জবানবন্দি— “শহীদের বুকে চালানো গুলির মূল্য বা হারানো অস্ত্রের মাশুল আমি দেব না।”
​যে পুলিশ বাহিনী জনগণের টাকায় কেনা অস্ত্র জনগণের বুকে চালিয়েছে, এবং নিজেদের ব্যর্থতায় তা হারিয়েছে, সেই অস্ত্র খোঁজার খরচ জনগণ বহন করবে না। এই ৫ লাখ টাকা ওই ব্যর্থ পুলিশ কর্মকর্তা বা হুকুমদাতার ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বেতন বা সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে আদায় করতে হবে। রাষ্ট্রীয় কোষাগার কোনো খয়রাতি তহবিল নয় যে, কর্মকর্তাদের বিলাসিতা আর ভুলের মাশুল সেখানে গুনতে হবে।
​আমরা ৪৭-এ ব্রিটিশদের তাড়িয়েছি, ৭১-এ পাকিস্তানিদের তাড়িয়েছি। কিন্তু আমরা কেবল প্রভু বদলেছি, খাঁচাটা বদলাইনি। রাষ্ট্রযন্ত্র আজো সেই ব্রিটিশদের মতো ‘ইজারাদারি’ কায়দায় চলছে। তারা দেশটাকে ৫ বছরের জন্য লিজ নেওয়া জমিদারি মনে করে। কিন্তু মনে রাখবেন, এই দেশে আজও নজরুলের রক্ত প্রবাহিত। আমরা সেই ‘চির বিদ্রোহী বীর’। আজ আর বাঁশরি নয়, বিষের বাঁশি বাজাতে হবে।

পুরস্কার নয়, আল্টিমেটাম চাই

আমেরিকা থেকে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, এই বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র তার নৈতিক দেউলিয়াত্ব ঘোষণা করেছে। আমাদের অবস্থান পরিষ্কার এবং আপোষহীন:

​পুরস্কার বাতিল: চোরকে পুরস্কার দেওয়ার এই ঘৃণ্য বিজ্ঞপ্তি অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।

আল্টিমেটাম: ৭ দিনের কঠোর আল্টিমেটাম দিন। যারা অস্ত্র জমা দেবে না, তাদের নাগরিকত্ব বাতিল করে ‘বেওয়ারিশ’ ঘোষণা করুন এবং সর্বোচ্চ রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলা দিন।

শ্বেতপত্র: ৫ আগস্টের আগে কার হুকুমে এলএমজি/এসএমজি বের করা হয়েছিল, সেই হুকুমদাতাদের নামের তালিকা শ্বেতপত্র আকারে প্রকাশ করতে হবে।

জনগণের টাকা নয়: যদি পুরস্কার দিতেই হয়, তবে তা ব্যর্থ কর্মকর্তাদের বেতন ও পেনশন থেকে কেটে দিতে হবে। এক পয়সাও জনগণের ট্যাক্স থেকে নেওয়া যাবে না।

আজ দৈনিক জাহান-এর পাতায় যে সত্য উচ্চারিত হলো, তা ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে। আপনারা ৫ লাখ টাকা দিয়ে অস্ত্র হয়তো কয়েকটা পাবেন, কিন্তু রাষ্ট্রের যে ‘মেরুদণ্ড’ ৫ আগস্টের পর নড়বড়ে হয়ে গেছে, তা কি ৫ কোটি টাকা দিলেও ফেরত পাবেন? রাষ্ট্রকে আজ সিদ্ধান্ত নিতে হবে—সে কি চোরের কাছে জিম্মি থাকবে, নাকি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে?

​প্রেমিকের খোঁজে থাকা আমার মাতৃভূমিকে আমি লুটেরাদের হাতে ছেড়ে দেব না। নজরুলের ভাষায় আজ আমি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলে দিতে চাই—
“মহা-বিদ্রোহী রণক্লান্ত,
আমি সেই দিন হবো শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না।”

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *