মাদারগঞ্জে প্রবাসীর স্ত্রীকে অবরুদ্ধ করে ধর্ষণের অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে; তদন্তে নেমেছে দল

আনিছুর রহমান আইয়ুব, মাদারগঞ্জ (জামালপুর) প্রতিনিধি

জামালপুরের মাদারগঞ্জে এক প্রবাসীর স্ত্রীকে দীর্ঘ ১১ দিন অবরুদ্ধ রেখে জোরপূর্বক একাধিকবার ধর্ষণ ও বিপুল পরিমাণ অর্থ-স্বর্ণালংকার আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এক স্থানীয় বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত নেতার নাম নিজাম উদ্দিন, তিনি মাদারগঞ্জ উপজেলা বিএনপির বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

​গত বুধবার (১ জুলাই) দিবাগত রাতে জামালপুর প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে মুর্শেদা আক্তার মিহা নামের ওই ভুক্তভোগী নারী এই তথ্য প্রকাশ করেন। এ ঘটনায় তিনি গত ৩০ জুন জামালপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এ একটি মামলাও দায়ের করেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগীর লোমহর্ষক বর্ণনা

​লিখিত বক্তব্যে মুর্শেদা আক্তার মিহা অভিযোগ করে বলেন, মাদারগঞ্জ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন তাকে সস্তায় জমি কিনে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন সময়ে তাঁর কাছ থেকে নগদ প্রায় ১৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং প্রায় ৮ ভরি স্বর্ণালংকার হাতিয়ে নেন। পরবর্তীতে তিনি জমি বা টাকা ফেরত চাইলে ক্ষিপ্ত হয়ে নিজাম উদ্দিন তাকে একাধিকবার জোরপূর্বক আটকে রাখেন।

​নির্যাতনের বিবরণ দিয়ে ভুক্তভোগী নারী আরও বলেন—

​”একপর্যায়ে টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে আমাকে ও আমার শিশুসন্তানকে অপহরণ করা হয়। চতুর নিজাম ডাবের পানির সাথে তীব্র চেতনানাশক মিশিয়ে আমাদের খাইয়ে দেয়। আমরা অচেতন হয়ে পড়লে আমাদের অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সামান্য জ্ঞান ফিরলে আমাকে প্রাণনাশের ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক সাদা স্ট্যাম্প ও কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। একইসাথে আমার আগের স্বামীকে তালাক দেওয়ার কাগজ, নিজামের সাথে জোরপূর্বক বিয়ে এবং নিজামকে ডিভোর্স দেওয়ার কাগজেও অগ্রিম টিপসই ও স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এরপর জামালপুর শহরের বোসপাডায় একটি ভাড়া বাসায় টানা ১১ দিন আমাকে অবরুদ্ধ রেখে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়। শুধু তাই নয়, ওই পাশবিক নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।”

​ভুক্তভোগী নারীর দাবি, আদালতে মামলা দায়ের করার পর থেকে বিবাদী ও তার সহযোগীরা তাকে এবং তার স্বামীকে প্রতিনিয়ত মামলা তুলে নেওয়ার জন্য প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছে। সংবাদ সম্মেলনে তিনি নিজের ও পরিবারের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অভিযুক্ত বিএনপি নেতাকে দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

এআই (AI) দিয়ে অশালীন ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগ

​সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মুর্শেদা আক্তারের স্বামী প্রবাসী সেলিম মিয়া। তিনি স্ত্রীর ওপর হওয়া এই অমানবিক নির্যাতনের তীব্র নিন্দা ও সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন। একই সাথে তিনি এক নতুন ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলে ধরে বলেন—

​”মামলা করার পর থেকে ক্ষিপ্ত হয়ে ওই বিএনপি নেতা ও তার চক্রটি আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ (Artificial Intelligence) প্রযুক্তির অপব্যবহার করছে। তারা আমার স্ত্রীর ছবি ও অশালীন ভুয়া ভিডিও তৈরি করে সামাজিকভাবে আমাদের হেয় প্রতিপন্ন করতে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে।”

অভিযোগ অস্বীকার বিএনপি নেতার

​এদিকে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত বিএনপি নেতা নিজাম উদ্দিন। যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, মুর্শেদা আক্তার আসলে তাঁর আইনসম্মত তৃতীয় স্ত্রী। রাজনৈতিকভাবে তাঁর ক্যারিয়ার ধ্বংস করতে এবং সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতেই টাকা ও স্বর্ণালংকার আত্মসাতসহ ধর্ষণের এই নাটক সাজানো হয়েছে, যা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

উপজেলা বিএনপির তদন্ত কমিটি গঠন

​এদিকে ঘটনাটি নিয়ে জামালপুরের রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) মাদারগঞ্জ উপজেলা বিএনপি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

​বিষয়টি নিশ্চিত করে মাদারগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মঞ্জুর কাদের বাবুল খাঁন গণমাধ্যমকে বলেন—

​”দলের একজন দায়িত্বশীল নেতার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, যা আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে জেনেছি। দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় ও সত্যতা যাচাইয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে যদি ওই নেতার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিন্দুমাত্র সত্যতা মেলে, তবে দলের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর সাংগঠনিক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো অপরাধীকে বিএনপি প্রশ্রয় দেবে না।”

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *