ফুলবাড়ীতে ধরলার তীব্র স্রোতে কালভার্ট ভেঙে ৫০ ফুট সড়ক বিলীন; যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ৫ শতাধিক পরিবার
মোস্তাফিজার রহমান (জাহাঙ্গীর), কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি

টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় ধরলা নদীর তীব্র স্রোতে চরগোরকমন্ডল এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের কালভার্ট ধসে পড়েছে। কালভার্ট ধসের পাশাপাশি পানির প্রবল চাপে সড়কটির প্রায় ৫০ ফুট অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে গত চার দিন ধরে ওই অঞ্চলের তিনটি আবাসন প্রকল্পের বাসিন্দাসহ অন্তত পাঁচ শতাধিক পরিবারের যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আকস্মিক এই ভাঙনে সবচেয়ে বেশি চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় শিক্ষার্থী, কৃষক, রোগী ও দৈনন্দিন কর্মজীবী মানুষ।
৩ আবাসনসহ ৫০০ পরিবারের চরম দুর্ভোগ
স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা যায়, গত কয়েকদিনের অবিরাম বৃষ্টিপাত এবং সীমান্ত পার হয়ে আসা উজানের ঢলে ধরলা নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়। সোমবার গভীর রাতে নদীর তীব্র স্রোত লোকালয়ে ঢুকে পড়লে আনন্দবাজার থেকে চরগোরকমন্ডল এলাকায় যাতায়াতের অন্যতম প্রধান সড়কের এই কালভার্টটি ভেঙে যায়।
সড়ক ভেঙে বড় গর্ত তৈরি হওয়ায় ওই রুটে মোটরসাইকেল, ভ্যান, অটোরিকশাসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচল একযোগে বন্ধ হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘ বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের সময় ও যাতায়াত ব্যয়—দুটোই কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
স্থায়ী বাঁধ ও সেতুর দাবি এলাকাবাসীর
ভাঙন কবলিত এলাকার পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। চরগোরকমন্ডল এলাকার বাসিন্দা আব্দুল ছালাম, রমজান আলী ও ছাইদুল ইসলাম বলেন—
”আমরা দীর্ঘদিন ধরে চরগোরকমন্ডল এলাকায় ধরলা নদীর তীরে একটি স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু প্রশাসন থেকে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় এক রাতের বৃষ্টি ও উজানের ঢলের তীব্র স্রোতে কালভার্টটি ধসে গেল। এখন আমাদের সাইকেল কাঁধে নিয়ে কোমরসমান নোংরা পানি পেরিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। আমরা দ্রুত সড়কটি পুনর্নির্মাণের দাবি জানাই।”
একই আবাসন এলাকার বাসিন্দা জাহানারা বেগম ও শাহিনা বেগম দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে বলেন—
”চার-পাঁচ দিন ধরে আমরা চরম গৃহবন্দী ও ভোগান্তির মধ্যে আছি। হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি ভেঙে আমাদের চলতে হচ্ছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা স্কুল-কলেজে যাওয়ার সময় শরীর ও বইখাতা ভিজিয়ে যাচ্ছে। এখানে তিনটি আবাসনসহ পাঁচ শতাধিক পরিবারের বসবাস। দ্রুত একটি নতুন সেতু নির্মাণ অথবা অন্তত বিকল্প চলাচলের জন্য একটা কাঠের সাঁকো তৈরি করা এখন খুবই জরুরি।”
স্কুলশিক্ষার্থী নাঈম মিয়াসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভাঙা অংশ পার হয়ে তাদের স্কুলে যেতে হচ্ছে। বিকল্প কোনো ভালো পথ না থাকায় প্রতিদিনই নোংরা পানিতে ভিজে যাতায়াত করতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত কষ্টদায়ক।
আশ্বাস দিলেন জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন
যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার বিষয়ে নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাছেন আলী বলেন—
”চরগোরকমন্ডল এলাকার কালভার্ট ধস ও সড়ক বিলীনের বিষয়টি আমি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখেছি এবং ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিত জানানো হয়েছে। দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে জরুরি ভিত্তিতে সাধারণ মানুষের বিকল্প চলাচলের ব্যবস্থা এবং স্থায়ীভাবে একটি সেতুসহ সড়ক পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
তবে ভিন্ন সুর শোনা গেছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সিরাজ দৌল্লার কণ্ঠে। তিনি জানান, চলতি অর্থবছরে এই প্রকল্পের জন্য নতুন কোনো জরুরি বরাদ্দ নেই। তবে নতুন অর্থ বছরে বরাদ্দ পাওয়া গেলে বড় পরিসরে একটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
এ প্রসঙ্গে ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) দিলারা আক্তার বলেন—
”বিষয়টি জানার পর আমি তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা প্রকৌশলীকে (এলজিইডি) অবহিত করেছি। তিনি সরেজমিনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাটি পরিদর্শনের পর স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ কমাতে এবং দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করতে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।”
