ধূর্তের নরকে বাসকারী হে নীতি-নির্ধারকগণ, এই ঘৃণ্য নাটক বন্ধ করুন!
শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

সারা জীবন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে, সততার চাদর গায়ে জড়িয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। আশা ছিল, পরপারে অন্তত এর প্রতিদান পাবেন। কিন্তু স্বর্গের গেটে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ! দেখছেন, আপনার বহু পেছনে বা নরকের সিরিয়ালে থাকার কথা ছিল যাদের—সেই সব চিহ্নিত পাপী আপনার আগেই ‘ফার্স্ট ক্লাস’ সিট দখল করে বসে আছে!
ব্যাপারটা কী? সামনের লোকটিকে জিজ্ঞেস করতেই সে ফিসফিস করে বলল, “ভাই, এরা তো মারা যাওয়ার ৬ মাস আগে ধর্মমন্ত্রীর ১৬ নম্বর চামচার সঙ্গে দেখা করেছিল। মাত্র ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে স্বর্গের ‘ভিআইপি পাস’ নিয়ে এসেছে! সরকারি টাকায় হজ করে এরা এখন শিশুর মতো—না না, শিশুর চেয়েও বেশি নিষ্পাপ!”
পৃথিবীতে যেমন ৫০০০ টাকা বৈধভাবে পাঠাতে আপনাকে বিকাশের দোকানে আইডি কার্ড দেখাতে হয়েছে, জেরার মুখে পড়তে হয়েছে—স্বর্গে গিয়েও দেখলেন পাপীরা ‘শর্টকাট’ নিয়ে আগে চলে গেছে।
এই অসম্ভব কল্পনা কেবল ‘আরব্য রজনী’র ফ্যান্টাসি উপন্যাসেই সম্ভব। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র এখন এই ফ্যান্টাসিকেই বাস্তবে রূপ দিতে চাইছে। লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারের নামে ৫ লাখ টাকা পুরস্কারের ঘোষণা দিয়ে তারা মূলত স্বৈরাচারের কলঙ্কের দাগ মুছতে চাইছে এবং নিজেরা টু-পাইস কামানোর ধান্দা করছে!
গোপনীয় বস্ত্রের প্রদর্শনী বনাম অদৃশ্য মেশিনগান
প্রথমেই আসি ৫ লাখ টাকার এই পুরস্কার ঘোষণার লজিক বা যুক্তিতে। পুলিশ সদর দপ্তরের যে বাঘা বাঘা কর্মকর্তারা এসি রুমে বসে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাদের সাধারণ জ্ঞান বা ‘কমন সেন্স’ নিয়ে আমার গভীর সন্দেহ আছে।

গোপনীয় বস্ত্র (অন্তরবাস) বনাম এলএমজি
৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের দৃশ্য আমাদের সবার মনে আছে। জনগণ যখন গণভবনে ঢুকেছিল, তখন তারা স্বৈরাচারের ‘গোপনীয় বস্ত্র’ (ব্রা-প্যান্টি বা অন্তরবাস) পর্যন্ত প্রকাশ্যে জনসম্মুখে তুলে ধরে উল্লাস করেছে। সারা দেশবাসী টিভিতে-ফেসবুকে দেখেছে, জনগণ লুটের মাল লুকিয়ে নেয়নি, বরং মাথার ওপর ঘুরিয়ে প্রদর্শন করেছে।
যুক্তিটা খুব সোজা—যে জনগণ স্বৈরাচারের ‘গোপনীয় বস্ত্র’ প্রকাশ্যে প্রদর্শন করতে পারে, তারা যদি মেশিনগান বা এলএমজি লুট করত, তবে সেটাও প্রকাশ্যে উঁচিয়ে ধরত। কিন্তু ৫ আগস্টের হাজার হাজার ভিডিও ফুটেজে আমরা কাউকে মেশিনগান কাঁধে উল্লাস করতে দেখিনি।
যে জিনিস প্রকাশ্যে নেওয়া হয়নি, অথচ ‘গায়েব’ হয়ে গেল—তা নিশ্চয়ই গোপনে সরানো হয়েছে। আর সাধারণ জনতা কখনো গোপনে অস্ত্র সরায় না। যারা গোপনে রাষ্ট্রীয় মারণাস্ত্র সরায়, তারা সাধারণ নাগরিক নয়—তারা ফ্যাসিস্টের ‘অবৈধ সন্তান’ (প্রশাসনের ভেতরের দোসর)।
শিলাবৃষ্টির ফ্যান্টাসি
আচ্ছা, এলএমজি (লাইট মেশিনগান) কি ‘শিলাবৃষ্টির পর শিল টোকানো’র মতো কোনো বিষয়? ঝড়ের পর বাচ্চারা যেভাবে রাস্তায় নেমে পকেটে শিল কুড়ায়, জনগণ কি সেভাবে মেশিনগান কুড়িয়ে পকেটে ভরেছে? ৩০-৪০ কেজি ওজনের একটা মাউন্টেড মেশিনগান কি আলুর বস্তা যে, কেউ দেখল না আর সেটা হাওয়া হয়ে গেল?
দামী গাড়ির ভদ্রলোক
দৃশ্যটা কল্পনা করুন—দামী গাড়ি থেকে স্যুট-কোট পরা কোনো ভদ্রলোক নামলেন। রাস্তার পাশে দেখলেন পুলিশের একটা এলএমজি পড়ে আছে। তিনি কি সেটা কুড়িয়ে গাড়ির ডিকিতে ভরবেন? অসম্ভব! ভদ্রলোকরা এসব ঝামেলায় যান না। অস্ত্রগুলো সরিয়েছে তারাই, যারা এর ব্যবহার জানে।

সততার মূল্য ও চোরের ওপর বাটপারি
রাষ্ট্র বলছে, “অস্ত্র ফেরত দিন, ৫ লাখ টাকা নিন, পরিচয় গোপন রাখা হবে।” শুনতে খুব মিষ্টি লাগছে, তাই না? কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ এক মরণফাঁদ।
সততার মূল্য কোথায়?
একজন রাষ্ট্রদ্রোহী বা চোরকে যদি ৫ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়, তবে আমরা যারা সারা জীবন আইন মেনে চললাম, ট্যাক্স দিলাম—আমাদের সততার মূল্য কী? রাষ্ট্র কি সৎ নাগরিকদের গালে চপেটাঘাত করছে না? যে নাগরিক এতদিন অস্ত্র জমা দেয়নি, সে তো আর নাগরিক নেই, সে রাষ্ট্রদ্রোহী। তাকে পুরস্কার দেওয়া মানে পাপকে উৎসাহিত করা।
আসল খেলা—চোরের ওপর বাটপারি!
সবচেয়ে হাস্যকর হলো, এই ৫ লাখ টাকা চোরও পাবে না। যে কমিটি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারা ভেবেছে জনগণ বোকা। তারা মূলত ‘চোরের ওপর বাটপারি’ করার প্ল্যান করেছে।
এই প্রকল্পটি এমনভাবে নেওয়া হয়েছে যে, কিছু অস্ত্র তারা ফেরত দেখাবেই (নিজেদের লোক দিয়ে বা পুলিশের ঘর থেকে এনে) এবং বাকি টাকা খেয়ে ফেলবে। অর্থাৎ কয়েকজনের কপাল পুড়বে এটা নিশ্চিত—যাদের ব্যবহার করে সাফল্যের গল্প তৈরি করা হবে। দিনশেষে টাকা ঢুকবে কমিটির পকেটে, আর নাম হবে ‘মিস্টার কল্পনা চাওলা’ বা ‘স্বর্গীয় শঙ্কর দাস’-এর।

ইতিহাসের শিক্ষা ও মীর জাফরের প্রেতাত্মা
মীর জাফরের প্রেতাত্মা
হাসাহাসি অনেক হলো, এবার একটু সিরিয়াস প্রশ্নে আসি। রাষ্ট্রের কাছে আমাদের জবাব চাই।
নৈতিক স্খলন ও মীর জাফর আলী খান
আপনাদের পরিচয়টা আগে জানা দরকার—আপনারা কারা? কাদের পারপাস সার্ভ করতে এসেছেন? যথেষ্ট পরিমাণ নৈতিক স্খলন না হলে আপনাদের তো এই পথে যাওয়ার কথা না।
আপনাদের পরিষ্কার জানিয়ে রাখি—ভুলবশতও যদি কোনোদিন ফ্যাসিস্ট বাংলাদেশের ক্ষমতায় পুনরায় আসে, আপনাদের দেওয়া তাদের আজকের কথা কি তারা রক্ষা করবে ভেবেছেন? ইতিহাসের প্রতিটি নিরীক্ষণ থেকেই এই জিনিসটা স্পষ্ট হয়ে আসে: যারা পলাশীর যুদ্ধের সেই মীর জাফর আলী খানের চরিত্রে আবির্ভূত হয়েছেন, তাদের ‘খান’ (খানদানি বা পরিণতি) অনেক উঁচুতে—যা পার্থিব ধরাছোঁয়ার সীমানা ছাড়িয়ে চলে যায়। মীর জাফরের শেষ রক্ষা হয়নি, আপনাদেরও হবে না।
আমরা অস্ত্রের ছবি ও তালিকা চাই
যেহেতু আপনারা বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন, তার মানে আপনারা জানেন কী কী হারিয়েছে। আমরা করদাতা হিসেবে সেই অস্ত্রের স্পষ্ট ছবি, বর্ণনা, ওজন এবং তালিকা চাই! জনগণকে অন্ধকারে রেখে এই নাটক আর কতদিন?

চোর ধরার আল্টিমেটাম ও ‘বেওয়ারিশ’ প্যাকেজ
রাষ্ট্র যদি সত্যি অস্ত্র উদ্ধার করতে চাইত, তবে ৫ লাখ টাকার ‘ঘুষ’ অফার না করে ৭ দিনের কঠোর আল্টিমেটাম দিত।
আমার প্রস্তাবিত ‘পুরষ্কারের প্যাকেজ’:
রাষ্ট্র ঘোষণা করুক—আগামী ৭ দিনের মধ্যে অস্ত্র জমা না দিলে:
- নাগরিকত্ব বাতিল: সংশ্লিষ্টদের নাগরিকত্ব বাতিল করে ‘বেওয়ারিশ’ ঘোষণা করা হবে।
- অন্ধকার জীবন: তাদের বাড়ির বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির লাইন বিচ্ছিন্ন করা হবে।
- সামাজিক বয়কট: তারা কোনো আইনজীবী নিয়োগ করতে পারবে না, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পাবে না।
- বোনাস সাজা: ৫ লাখ টাকা পুরস্কারের লোভে যারা বসে ছিল, ধরা পড়লে ওই টাকার সমপরিমাণ ‘বাড়তি সাজা’ তাদের খাটতে হবে।
পরিশেষে বলি, যে কমিটি চোখ বুজে কাকের মতো এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাদের পরিকল্পনা আজ জনগণের সামনে উলঙ্গ হয়ে গেছে—ঠিক যেমন ৫ আগস্টে গণভবনের উলঙ্গ বস্ত্র প্রদর্শনী হয়েছিল। ৫ লাখ টাকার এই টোপ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য নয়, বরং ফ্যাসিস্টের অবৈধ সন্তানদের পাপ মোচন এবং নিজেদের পকেট ভারি করার এক নির্লজ্জ প্রহসন।
হে নীতি-নির্ধারকগণ, আপনারা বোকার স্বর্গে নন, ধূর্তের নরকে বাস করছেন। এই নাটক বন্ধ করুন। হুকুমদাতাদের রিমান্ডে নিন, দেখবেন—মাটি খুঁড়ে মেশিনগান বেরিয়ে আসছে। আপনাদের এই কাঁচা অভিনয় দেখে জাতি এখন হাসছে আর বলছে—“দেখেন কাণ্ড, চোরের ওপর বাটপারি!”
