তারেক রহমান, আপনাকে বলছি : পর্ব -০১
শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

১৭টি বছর।
ক্যালেন্ডারের পাতায় এটি কেবল একটি সংখ্যা হতে পারে, কিন্তু একটি মানুষের জীবনের জন্য তা এক মহাকাব্যিক দহনকাল। টেমস নদীর পাড়ে কতবার ঋতু বদলেছে, আর এদিকে পদ্মা-মেঘনার জল গড়িয়েছে বহুদূর। কিন্তু আজ যেদিন আপনি ফিরলেন, আমি হলফ করে বলতে পারি—যে তারেক রহমান দেশ ছেড়েছিলেন, আর যে তারেক রহমান আজ ফিরলেন—তারা এক নন। আগুনের পরশমণিতে ছোঁয়া দিয়ে সোনা যেমন খাঁটি হয়, গত দেড় যুগের নির্বাসন, বিদেশের মাটিতে একাগ্র জীবন আর বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ব্রিটেনে আপনার অবস্থান আপনাকে পুড়িয়ে খাঁটি করেছে। আমরা আপনার মধ্যে এখন আর কোনো ‘রাজপুত্র‘কে দেখি না, আমরা দেখি ঝড়ের রাতে হাল ধরতে সক্ষম এক পরিপক্ব রাষ্ট্রনায়ককে।
বাস্তবে বৃটেনের চাইতে বৃহত বাংলাদেশ
তারেক রহমান, আপনাকে খুব স্পষ্ট করে একটি সত্য বলতে চাই। আজ যদি আমরা ইংল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করতে বসি, তবে তা হবে বড়ই বেমানান। কেবল জনসংখ্যা আর আয়তন ছাড়া ইংল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের আর কোনো ইতিবাচক সূচকেই তুলনা চলে না। ওরা যোজন যোজন এগিয়ে। সভ্যতার মাপকাঠিতে, আইনের শাসনে, কিংবা মানবিক মর্যাদায়—ইংল্যান্ড যেখানে দাঁড়িয়ে, বাংলাদেশ সেখানে এক ভুক্তভোগী জনপদ। কিন্তু এই বিশাল ব্যবধানের সত্যটা জেনেই আমরা আপনাকে ঘিরে স্বপ্ন দেখছি। কারণ, আপনি ওই উন্নত সভ্যতার বাতাস গায়ে মেখেছেন, আপনি দেখেছেন একটি রাষ্ট্রযন্ত্র কতটা নিখুঁতভাবে চলতে পারে।

আমরা সেই বাংলাদেশ চাই
যা আমাদের কল্পনায় ভাসে কিন্তু বাস্তবে ধরা দেয় না। আমরা এমন এক রাষ্ট্র চাই—
যে দেশে কোনো নারীকে মাঝরাতে একা বাড়ি ফিরতে ভয় পেতে হবে না, কোনো নরপশুর লোলুপ দৃষ্টি তাকে স্পর্শ করবে না।
আমরা এমন এক সমাজ চাই—যেখানে কোনো ফুলের মতো শিশুকে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হতে হবে না, কোনো মায়ের কোল অকালে খালি হবে না।
আমরা এমন এক অর্থনীতি চাই—যেখানে পেটের দায়ে কোনো মানুষকে তার সম্ভ্রম বিক্রি করতে হবে না, ক্ষুধার জ্বালায় মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিতে হবে না।
আমরা এমন এক প্রশাসন চাই—যেখানে সাধারণ মানুষ পুলিশ দেখলে আতঙ্কিত হবে না, বরং ভরসা পাবে।

রাষ্ট্রকে বদলে দিতে হাজারো মানুষের দরকার হয় না
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, একটি জরাজীর্ণ, দুর্নীতিতে ঘুণে ধরা রাষ্ট্রকে বদলে দিতে হাজার হাজার মানুষের দরকার হয় না। প্রয়োজন হয় মাত্র একজন ভিশনারি মানুষের—একজন ‘অরিজিনাল কান্ডারী’র। আমাদের চোখের সামনেই তো আছে সেই জ্বলজ্বলে উদাহরণ—সিঙ্গাপুরের লিকুয়ান ইউ। ১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়া থেকে আলাদা হওয়ার পর লিকুয়ান ইউ যখন জনসমক্ষে কাঁদছিলেন, তখন সিঙ্গাপুর ছিল এক অবহেলিত জলাভূমি। কিন্তু তার বুকের ভেতর ছিল ইস্পাত কঠিন এক জেদ। তিনি বলেছিলেন, “আমি সিঙ্গাপুরকে গড়ে তুলব।” এবং তিনি তা করে দেখিয়েছিলেন।
আজকের বাংলাদেশ সেই ১৯৬৫ সালের সিঙ্গাপুরের চেয়েও বড় সংকটে। কিন্তু তারেক রহমান, এই ১৭ বছর আপনি সভ্য দুনিয়ার যে ‘সিস্টেম‘ দেখেছেন, যে ডিসিপ্লিন নিজের মধ্যে ধারণ করেছেন—তার ছিটেফোঁটাও যদি এই বদ্বীপের মাটিতে প্রয়োগ করেন, তবে এই দেশটা বদলাতে বাধ্য।

আপনি কি পারবেন ‘সোনার বাংলা’ উপহার দিতে?
আমি কোনো দলের কর্মী নই! আমি এদেশের নাগরিক! আমি এই বাংলার মাটির এক সন্তান হিসেবে
নিয়ম ভেঙ্গে, ব্যাকরণ বিহীনভাবে লিখছি। আমি লিখছি, কারণ আমাকেও একদিন আমার সৃষ্টিকর্তার সামনে দাঁড়াতে হবে। হাশরের ময়দানে যেন বুক চিতিয়ে বলতে পারি—”হে আল্লাহ, আমার মাতৃভূমি যখন দিকভ্রান্ত ছিল, আমি চুপ থাকিনি। আমি আমার কলম দিয়ে সত্যের পথ দেখিয়েছিলাম, আমি শাসকের চোখে চোখ রেখে বলেছিলাম—আমার দেশের মানুষের নিরাপত্তা দাও, তাদের সম্মান দাও।”
এই জাতি আজ আপনার দিকে তাকিয়ে আছে এক বুক আশা নিয়ে। শুধু আবেগ দিয়ে নয়, ১৭ বছরের ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া প্রজ্ঞা দিয়ে এই মরা গাঙে জোয়ার আনার দায়িত্ব এখন আপনার কাঁধে। আপনি কি পারবেন আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত ‘সোনার বাংলা‘ উপহার দিতে?
