শিশু রামিসা হত্যা মামলার চূড়ান্ত রায়: ঘাতক দম্পতি সোহেল ও স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ড
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে মাত্র আট বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর অত্যন্ত নির্মমভাবে গলা কেটে ও খণ্ড-বিখণ্ড করে হত্যার আলোচিত মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয়েছে। গত রবিবার (৭ জুন ২০২৬) ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক মাসরুর সালেকীন এই ঐতিহাসিক রায়ে মূল আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন।
সর্বোচ্চ সাজা ও অর্থদণ্ড
আদালতের রায় অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(২) ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় আসামিদের এই সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আদালত প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেছেন। এই অর্থদণ্ডের সম্পূর্ণ টাকা ভুক্তভোগী শিশু রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারী (তার পরিবার) পাবেন। আসামিরা এই ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যর্থ হলে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে সেই টাকা ভুক্তভোগীর পরিবারকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
১৬ দিনের রেকর্ড সময়ে নজিরবিহীন বিচার
ঘটনার ভয়াবহতা বিবেচনা করে রাষ্ট্রপক্ষ ও আদালতের অভাবনীয় তৎপরতায় মাত্র ১৬ দিনের রেকর্ড সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন, সাক্ষীদের জবানবন্দি ও জেরা, আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ করা হয়। বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এত দ্রুততম সময়ে কোনো হত্যা মামলার রায় প্রদান একটি নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক আইনি মাইলফলক।
গত ২ জুন দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ট্রাইব্যুনাল চার্জশিটভুক্ত ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের জবানবন্দি ও জেরা সম্পন্ন করেন। মামলার বাদী ও রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার অশ্রুসিক্ত জবানবন্দির মাধ্যমে এই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছিল। এরপর পর্যায়ক্রমে ভুক্তভোগীর মা পারভীন আক্তার, বড় বোন রাইসা আক্তার (ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে), সুরতহাল প্রস্তুতকারী পুলিশ কর্মকর্তা, ময়নাতদন্তকারী ফরেনসিক চিকিৎসক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে নিজেদের জবানবন্দি দেন। শুনানির সময় পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বিবরণ শুনে পুরো আদালতকক্ষে এক স্তব্ধ ও শোকের আবহ তৈরি হয়।
আদালতে উপস্থাপিত লোমহর্ষক বিবরণ ও ফরেনসিক রিপোর্ট
আদালতে রামিসার সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী কর্মকর্তা এসআই মো. ইকবাল হোসেন জানান, ঘটনাস্থল থেকে একটি জর্জেটের ওড়না উদ্ধার করা হয়, যা দিয়ে শিশুটির মুখ শক্ত করে বেঁধে পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। আসামিদের শয়নকক্ষের খাটের নিচে মাথা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রামিসার দেহ পড়ে ছিল এবং ঘরের এক কোণায় রক্তমাখা পানির বালতির ভেতর থেকে তার কাটা মাথাটি উদ্ধার করা হয়। লাশ চিরতরে গুম করার উদ্দেশ্যে শিশুটির হাত-পা আলাদা করার পাশাপাশি ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার শরীরে মারাত্মক ক্ষত সৃষ্টি করা হয়েছিল।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. নাসাদ জাবিন তার ময়নাতদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করেন, অত্যন্ত ধারালো অস্ত্র বা ছুরি দিয়ে গলা কেটে মাথা বিচ্ছিন্ন করার কারণেই রামিসার তাৎক্ষণিক মৃত্যু হয়। ফরেনসিক ও ডিএনএ (DNA) টেস্টে স্পষ্ট প্রমাণিত হয়েছে যে, মৃত্যুর পূর্বে শিশুটিকে অত্যন্ত পাশবিক উপায়ে ধর্ষণ করা হয়েছিল।
ঘটনার ব্যাকগ্রাউন্ড ও আসামিদের গ্রেপ্তার
মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ১৯ মে সকালে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা ঘর থেকে বের হলে তাকে কৌশলে নিজেদের ফ্ল্যাটে ডেকে নেয় প্রতিবেশী স্বপ্না আক্তার। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে সোহেলের দরজার সামনে মেয়ের জুতা দেখতে পেয়ে রামিসার মা-বাবা প্রতিবেশীদের নিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং রামিসার খণ্ড-বিখণ্ড মরদেহ দেখতে পান।
মামলার মূল তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান জানান, ঘটনার পর রামিসার মা দরজা খোলার জন্য বারবার আকুতি জানালেও খুনি দম্পতি দরজা খোলেনি। তারা তখন ভেতরে বাথরুমে শিশুটিকে হত্যা করে লাশ গুমের পৈশাচিক খেলায় লিপ্ত ছিল। এমনকি গ্রেপ্তারের ঠিক আগ মুহূর্তে তারা রক্তাক্ত ঘরের সমস্ত আলামত পানি দিয়ে ধুয়ে নষ্ট করার চেষ্টা চালিয়েছিল। পরবর্তীতে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয় এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে মূল ঘাতক সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে।
গতকাল রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যাপক জোরদার করা হয়েছিল। অতিরিক্ত পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও পুরো এলাকায় তৎপর ছিলেন। এই দৃষ্টান্তমূলক রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে ভুক্তভোগী পরিবার ও সাধারণ মানুষ।
