খালিয়াজুরীতে এইচএসসি সনদ ছাড়াই ৪৩ বছর শিক্ষকতা! কৃষকলীগ নেতার বিরুদ্ধে ভুয়া নিয়োগ ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

মো: হাবিবুল্লাহ, খালিয়াজুরী (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি

নেত্রকোনা জেলার হাওরাঞ্চল খালিয়াজুরীতে এইচএসসি পাস না করে ও কোনো সনদপত্র ছাড়াই দীর্ঘ ৪৩ বছর ধরে সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত শিক্ষক মোঃ আব্দুল মোনায়েম উপজেলার নূরপুর বোয়ালী দাখিল মাদ্রাসায় ১৪তম গ্রেডে এবতেদায়ী জুনিয়র শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন এবং তিনি উপজেলা কৃষকলীগের যুক্ত আহ্বায়ক।

​জালিয়াতি, বয়সের গরমিল ও সনদহীন চাকরির বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে উক্ত মাদ্রাসার এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সম্প্রতি খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও), নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক (ডিসি), মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন।

কম বয়সে নিয়োগ ও অঙ্গীকার ভঙ্গের অভিযোগ

​দাখিলকৃত অভিযোগ ও দাপ্তরিক কাগজপত্র সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৩ সালের ২ নভেম্বর আব্দুল মোনায়েম নূরপুর বোয়ালী দাখিল মাদ্রাসায় যোগদান করেন। তাঁর এসএসসি সনদ অনুযায়ী জন্ম তারিখ ২ জানুয়ারি ১৯৬৭। সেই হিসেবে চাকরিতে যোগদানের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর ১০ মাস। তৎকালীন সময়ে নিয়ম অনুযায়ী কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কিংবা লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরপত্র ছাড়াই তাঁকে বেআইনিভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

​পরবর্তীতে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের ১৯৯২ সালের এক বিশেষ স্মারক অনুযায়ী শিক্ষকতা বহাল রাখতে তাঁকে এইচএসসি পাস করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর প্রেক্ষিতে তিনি ১৯৯৪ ও ১৯৯৬ সালে দু’বার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলেও অকৃতকার্য হন। ১৯৯৭ সালে মাদ্রাসা সুপারের কাছ থেকে লিখিত অনুমতি নিয়ে ১৯৯৮ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অঙ্গীকার করলেও তিনি আর পরীক্ষায় অংশ নেননি। এভাবে এইচএসসি সনদ ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা তুলে আসছেন।

রেজুলেশন জালিয়াতি ও মামলা

​অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০১৭ সালে উক্ত মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির শিক্ষক প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি জালিয়াতির আশ্রয় নেন। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বিভিন্ন তারিখের মোট ৬টি রেজুলেশনে ম্যানেজিং কমিটির ৫-৬ জন সদস্যের স্বাক্ষর জাল করে প্রায় ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন।

​এ ঘটনায় খালিয়াজুরী বিজ্ঞ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতে একটি সিআর মোকদ্দমা (মামলা নং ৩০(১)/২০২০) দায়ের করা হয়, যেখানে তদন্ত শেষে আব্দুল মোনায়েমের বিরুদ্ধে স্বাক্ষর জালিয়াতির সত্যতা প্রমাণিত হয়।

রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আসামী ও অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিতি

​অভিযোগকারী জানান, গত বছরের ২ জুলাই ২০২৫ তারিখে খালিয়াজুরী থানায় দায়েরকৃত একটি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামী হিসেবে আত্মগোপনে ছিলেন অভিযুক্ত এই শিক্ষক। কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমতি ছাড়াই তিনি ৩ জুলাই ২০২৫ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। এ ঘটনায় মাদ্রাসার সুপার তাঁকে ১৭ জুলাই, ২৮ জুলাই ও ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে মোট তিনটি কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করেন। এরপরেও তিনি প্রভাব খাটিয়ে বেতন-ভাতা উত্তোলন করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযুক্ত শিক্ষক ও সুপারের বক্তব্য

​অভিযোগের ব্যাপারে অভিযুক্ত শিক্ষক মোঃ আব্দুল মোনায়েম বলেন—

​”অত্র মাদ্রাসায় যোগদানের সময় আমার বয়স ১৬ বছর ১০ মাস ছিল, তা জেনেই তৎকালীন কমিটি আমাকে নিয়োগ দিয়েছিল। ১৯৯৪ ও ৯৬ সালে আমি কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম কিন্তু পাস করতে পারিনি। এছাড়া আমি কোনো জাল-জালিয়াতি বা দুর্নীতির সাথে জড়িত নই।”

​মাদ্রাসার বর্তমান সুপার মোঃ হারুন অর রশিদ জানান—

​”আমি ২০২৩ সালের জুন মাসে যোগদান করেছি। যোগদানের পর শিক্ষক আব্দুল মোনায়েমকে বারবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে সনদ নেওয়ার তাগিদ দিলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। এছাড়া অনুমতি ছাড়া দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে তাঁকে ৩ বার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে অঙ্গীকারনামা দিলে তাঁর স্থগিত বিল প্রদান করা হয়। তবে তিনি এইচএসসি পাস করেননি—এ কথা সত্য।”

প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থার আশ্বাস

​এ বিষয়ে খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অলিদুজ্জামান জানান, অভিযোগটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। বিষয়টি তদন্তের জন্য তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে সত্যতা মিললে উক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

​নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক (ডিসি) খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন—

​”অভিযোগপত্রটি আমরা পেয়েছি। বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত সাপেক্ষে দোষ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি তাঁর ৪৩ বছরে অবৈধভাবে উত্তোলন করা সমস্ত সরকারি বেতন-ভাতা সরকারি কোষাগারে ফেরত আনার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *