ইউএনও: এমপি নাকি মন্ত্রী, তাদেরকে ফুল দিয়ে বরণ করা সাংবাদিকতা পেশার পরিপন্থী নয় কি?
মোহাম্মদ উল্যা, নোয়াখালী জেলা প্রতিনিধি

উপজেলায় নতুন নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দায়িত্ব গ্রহণ করলে ফুলের তোড়া দিয়ে অভিনন্দন জানানোর প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর পাশাপাশি এবার কিছু গণমাধ্যমকর্মীও এই সৌজন্য বিনিময়ে অংশ নিচ্ছেন। আর এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই সাংবাদিক মহলে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র বিতর্ক—এটি কি পেশাগত নৈতিকতার লঙ্ঘন, নাকি নিছক সামাজিক সৌজন্য?
নীতিমালা ও নৈতিকতার প্রশ্ন
বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের আচরণবিধি ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস (IFJ)-এর নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, সাংবাদিকদের এমন কোনো উপহার, অনুগ্রহ বা সুবিধা গ্রহণ-প্রদান থেকে বিরত থাকা উচিত, যা তাদের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে বা স্বার্থসংঘাত তৈরি করতে পারে। অনেকের মতে, ফুল দেওয়া সরাসরি ঘুষ নয়, তবে এটি এমন একটি প্রতীকী আচরণ, যা সাংবাদিক ও প্রশাসন সম্পর্ককে অস্বাভাবিকভাবে ঘনিষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সাংবাদিকতা নীতিমালায় ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস (IFJ) স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, সাংবাদিকদের যেকোনো ধরনের পক্ষপাত সৃষ্টি করতে পারে এমন উপহার, সম্মাননা বা অনুগ্রহ গ্রহণ বা প্রদান থেকে বিরত থাকা উচিত।
পিআইবি ছাত্রদের অভিমত
- পিআইবি ছাত্রের অভিমত: মিডিয়া নীতি কী বলে, আমি সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা (পিআইবি) ছাত্র হিসেবে অভিমত, ফুল দেওয়া কোনো অপরাধ নয়, কিন্তু এটি সাংবাদিকের ভূমিকাকে সোর্সকে ফ্রেন্ডলি করে তোলে, যা তদন্তধর্মী বা সমালোচনামূলক রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করতে পারে।
- পিআইবি প্রাক্তন ছাত্র: পিআইবি’র আরেক প্রাক্তন ছাত্র বলছেন, সাংবাদিকদের উচিত এমন আচরণ থেকে বিরত থাকা, যা তাদের পেশাগত অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে, কারণ গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা তার নিরপেক্ষতার ওপরই প্রতিষ্ঠিত।
স্থানীয় পর্যায়ে কিছু সাংবাদিকের এই ধরনের অংশগ্রহণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা মন্তব্য দেখা যাচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, সাংবাদিকদের উচিত প্রশাসন, রাজনৈতিক দলসহ সব পক্ষের সঙ্গে একটি পেশাগত দূরত্ব বজায় রাখা, যাতে তাদের রিপোর্টিংয়ের ওপর কোনো ধরনের প্রভাব বা চাপ সৃষ্টি না হয়। আবার কেউ কেউ বলছেন, ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর মতো বিষয়কে অতিরিক্ত বড় করে দেখলে অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
তবে অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ পেশাজীবী একমত—সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে আস্থাই মূল শক্তি, আর সেই আস্থা বজায় রাখতে নিরপেক্ষতা ও নৈতিক মানদণ্ডের কোনো বিকল্প নেই। তাই যেকোনো আচরণ বা কর্মকাণ্ড তা যত ছোট হোক, যদি প্রশ্নের জন্ম দেয়, সেক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিত।
নতুন ইউএনওদের দায়িত্ব গ্রহণে সাংবাদিকদের অভিনন্দন জানানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা তাই শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্য নয়, বরং গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ও পেশাগত মানদণ্ড রক্ষার বৃহত্তর প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
