এই ক্রান্তিলগ্নে খান সাঈদ হাসান-ই শেষ ভরসা!
শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

মহাকালের সাক্ষী এই বাংলা। পলাশীর আম্রকানন থেকে একাত্তরের রেসকোর্স—ইতিহাস বারবার বাঁক বদল করেছে। কিন্তু একটি জায়গায় আমরা যেন স্থবির হয়ে আছি, তা হলো আমাদের আইনশৃঙ্খলার দর্শন। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস যে পুলিশি কাঠামোর বীজ বপন করেছিলেন এবং পরবর্তীতে ১৮৬১ সালের পুলিশ অ্যাক্ট দিয়ে যা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল, তা ছিল মূলত শাসকের লাঠি, সেবকের হাত নয়।
আজ স্বাধীন বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে এসেও আমরা সেই ঔপনিবেশিক প্রভূ-ভৃত্য সম্পর্কের জং ধরা শিকল পায়ে জড়িয়ে হাঁটছি। রাষ্ট্র যখন সংস্কারের স্বপ্নে বিভোর, তখন প্রশ্ন জাগে—এই জরাজীর্ণ খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসার সাহস কার আছে? কে পারবেন এই ভাঙা ঘরে নতুন ভোরের আলো আনতে?
এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের জন্য আমাদের এমন একজন সেনাপতি প্রয়োজন, যার মস্তিস্কে আছে মেধার দীপ্তি, হৃদয়ে আছে মানবিকতার ফল্গুধারা আর মেরুদণ্ডে আছে ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা। বর্তমান প্রেক্ষাপট, বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সমীকরণ এবং বিসিএস রেকর্ড বুক বিশ্লেষণ করলে একটি নাম ধ্রুবতারার মতো জ্বলে ওঠে।
মেধার শীর্ষবিন্দু ও শৃঙ্খলার ধ্রুপদী ব্যাকরণ!
পুলিশ বাহিনী কোনো আবেগনির্ভর প্রতিষ্ঠান নয়, এটি চলে লজিক, আইন এবং শৃঙ্খলার এক অদৃশ্য জ্যামিতিতে। খান সাঈদ হাসান! যিনি বিসিএসের ওই বছরে সম্মিলিত মেধা তালিকার তৃতীয়, এবং পুলিশের মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অধিকারী বা ‘ফার্স্ট অফিসার’।
এই ‘প্রথম’ হওয়াটা কেবল একটি পরীক্ষার ফলাফল নয়, এটি তাঁর মেধার গভীরতা ও ধ্রুপদী শৃঙ্খলার প্রমাণ। একজন ফার্স্ট অফিসারকে স্বভাবতই আইনের খুঁটিনাটি, পলিসি মেকিং এবং ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে অন্যদের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে থাকতে হয়।
তাঁর সহকর্মীদের সাথে কথা বলে আর তার অধীনে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, তিনি যখন কোনো ফাইল ধরেন, তখন তিনি কেবল একজন পুলিশ অফিসার থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন একজন গবেষক। সমস্যার শেকড় সন্ধানে তিনি ক্লান্তিহীন। বর্তমান বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে পুলিশি চেইন-অব-কমান্ড বা শৃঙ্খলার যে ধস নেমেছে, তা কোনো সাধারণ জোড়াতালি দিয়ে মেরামত সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন এমন একজন ‘তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক’ জ্ঞানসম্পন্ন আর্কিটেক্ট, যিনি নিজেকে কাজের মধ্যে ষোল আনা ঢেলে দিতে পারেন; তিনি জানেন কোথায় হাতুড়ি মারতে হবে আর কোথায় সুচের সেলাই দিতে হবে!
এক দার্শনিক : অবরুদ্ধ পথ বনাম উন্মুক্ত দুয়ার
আমাদের দেশে ‘ক্ষমতা’ শব্দটির একটি নেতিবাচক আভিজাত্য তৈরি হয়েছে। এখানে ক্ষমতা মানেই সাইরেন বাজিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা, সাধারণ মানুষকে রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রেখে ভিআইপি প্রটোকলের মহড়া দেওয়া। এই অসুস্থ সংস্কৃতির ভিড়ে খান সাঈদ হাসান এক বিস্ময়কর ব্যতিক্রম, যেন মরূদ্যানে ধূলিকণার শীর্ষে জমে থাকা শিশির। তাঁর প্রশাসনিক দর্শনের মূলমন্ত্রটি আমি উদ্ধার করতে পেরেছি, যা তিনি প্রায়শই তাঁর শিষ্যদের বলতেন—
“ক্ষমতা পথ রোধ করে নয়, রোধ করা পথ খোলার মাধ্যমে প্রদর্শন করতে হয়।”
এই একটি বাক্যের ওজন হাজার পৃষ্ঠার আইনের বইয়ের চেয়েও বেশি। এর অর্থ গভীর ও সুদূরপ্রসারী।
তিনি বিশ্বাস করেন, জ্যামে আটকে থাকা অ্যাম্বুলেন্স বা অফিসগামী সাধারণ মানুষের পথ সুগম করে দেওয়াই প্রকৃত কমান্ডারের কাজ। তাঁর এই দর্শনের মধ্যে আমি খুঁজে পাই সেই ‘বিকেল বেলার প্রশান্তি’—যেখানে দিনের প্রখর তেজ নেই, আছে স্নিগ্ধতা, আছে মানুষের প্রতি মমত্ববোধ। তিনি সেই বিরল প্রজাতির শাসক, যিনি প্রটোকলের কাঁচঘেরা দেয়াল ভেঙে মানুষের ঘামের মূল্য দিতে জানেন।
মহামন্দার কালে মিতব্যয়ী নেতৃত্বের অপরিহার্যতা
বিশ্ব অর্থনীতি যখন টালমাটাল, বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। এই সময়ে পুলিশ বাহিনীর মতো বিশাল বাজেটের একটি সংস্থায় ‘খরচ কমানো’ বা কৃচ্ছসাধন কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, রাষ্ট্রীয় হুকুম। খান সাঈদ হাসানের ক্যারিয়ার গ্রাফে একটি বিষয় উজ্জ্বল—তিনি ঘোরতর মিতব্যয়ী। তবে তাঁর মিতব্যয়িতা মানে কৃপণতা নয়, বরং সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার (Optimization of Resources)।
অনেকে যেখানে পদোন্নতি পেলে অফিস সজ্জা, নতুন গাড়ি আর বিলাসিতায় মগ্ন থাকেন, সেখানে তিনি ব্যস্ত থাকেন বিদ্যমান সম্পদ দিয়ে কীভাবে লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়ানো যায়। তিনি জানেন, জনগণের ট্যাক্সের প্রতিটি পয়সা আমানত। অযথা খরচ বা অপচয় তাঁর কাছে একটি প্রশাসনিক অপরাধ।
একজন আইজিপি যদি ব্যক্তিগত জীবনে ও দাপ্তরিক কাজে মিতব্যয়ী হন, তবে পুরো বাহিনীর বাজেট ব্যবস্থাপনায় যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে, তা বলাই বাহুল্য। এই সময়ে এমন একজন ‘ইকোনমিক স্ট্র্যাটেজিস্ট’ পুলিশের শীর্ষে থাকাটা রাষ্ট্রের জন্য আশীর্বাদ।
কৌশলগত নীরবতা: দুর্বলতা নাকি ঝড়ের পূর্বাভাস?
সম্প্রতি কিছু অনিয়ম বা অন্যায়ের সময় খান সাঈদ হাসানকে আমরা নীরব থাকতে দেখেছি। সমালোচকরা একে দুর্বলতা বলতে পারেন, কিন্তু গভীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিশ্লেষণে দেখা যায়—এটি ছিল তাঁর ‘কৌশলগত অবস্থান’ (Strategic Silence)। একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি ততটুকুই চুপ থেকেছেন, যতটুকু থেকে তিনি নিরবে পরিমাপ করতে পারেন। তিনি জানতেন, অসময়ে জ্বলে উঠলে প্রদীপ নিভে যাবে, কিন্তু সঠিক সময়ের জন্য তেল সঞ্চয় করে রাখলে তা মশাল হয়ে জ্বলবে।
তিনি অন্যায় দেখে চুপ ছিলেন না, তিনি অপেক্ষা করছিলেন সঠিক হাতিয়ারের। আজ সময় এসেছে। তাঁর হাতে যদি পূর্ণ ক্ষমতা বা আইজিপির ব্যাটন তুলে দেওয়া হয়, তবে তাঁর সেই দীর্ঘদিনের সঞ্চিত নীরবতা অন্যায়ের বিরুদ্ধে হয়ে উঠবে ঝড়ের বজ্রাঘাত! তিনিই সেই সুপ্ত আগ্নেয়গিরি, যা অগ্ন্যুৎপাতের জন্য সঠিক মুহূর্তের অপেক্ষায় ছিল।
ধ্রুবতারার মতো দিশা দেখানোর ক্ষমতা
শিক্ষক, সংস্কারক ও ‘বাঙালির বিধান’-এর স্বপ্ন
পুলিশ বাহিনীতে ‘বস’ বা হুকুমদাতার অভাব নেই, অভাব আছে ‘শিক্ষক’-এর। খান সাঈদ হাসান তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য দক্ষ অফিসার তৈরি করেছেন। তিনি ধমক দিয়ে নয়, শিখিয়ে কাজ আদায় করেন। তাঁর এই শিক্ষকসুলভ মনোভাব বাহিনীকে মানবিক করতে সাহায্য করবে। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন পুলিশ সদস্যের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তার ব্যবহার, তার বন্দুক নয়।
সবচেয়ে বড় কথা, পুলিশকে ঔপনিবেশিক খোলস থেকে বের করে আনার জন্য যে ভিশন বা দূরদর্শিতা দরকার, তা তাঁর আছে। লর্ড কর্নওয়ালিসের প্রেতাত্মা থেকে পুলিশকে মুক্ত করে আমাদের নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের আলোকে ‘বাঙালির বিধান’ প্রবর্তন করার সাহস ও মেধা তাঁর রয়েছে। উপর থেকে তো কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই—তবে কেন আমরা আমাদের নিজস্ব পুলিশ আইন তৈরি করব না? পরিবর্তন তো একদিন হবেই, কেউ না কেউ তো করবেই। তবে খান সাঈদ হাসানের মতো যোগ্য নেতৃত্ব থাকতে আমরা কেন পিছিয়ে থাকব?
ইতিহাসের দায় ও সঠিক সিদ্ধান্ত
দিনশেষে, একটি বাহিনী কেমন চলবে তা নির্ভর করে তার চালকের ওপর। আমরা যদি এমন কাউকে বেছে নিই যিনি কেবল গায়ের জোরে বা চটকদার কথায় চলেন, তবে আমরা আবারও সেই অন্ধকারেই ফিরে যাব। কিন্তু আমরা যদি এমন কাউকে বেছে নিই—যার মধ্যে আছে সকালের মেধার দীপ্তি, দুপুরের কর্মচাঞ্চল্য, বিকেলের মানবিক স্নিগ্ধতা আর রাতের ধ্রুবতারার মতো দিশা দেখানোর ক্ষমতা—তবে খান সাঈদ হাসানই সেই নাম।
আজকের এই ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে, লর্ড কর্নওয়ালিসের কোড ছুড়ে ফেলে ‘বাঙালির বিধান’ রচনার জন্য খান সাঈদ হাসানের কোনো বিকল্প নেই।
আজ নীতিনির্ধারকদের ফাইনাল পরীক্ষা
তারা কি গতানুগতিক স্রোতে গা ভাসাবেন, নাকি ইতিহাসের পাতায় একটি সঠিক সিদ্ধান্তের স্বাক্ষর রাখবেন? কারণ, দেশপ্রেমিকের কাছে দেশই সবার আগে, আর খান সাঈদ হাসান সেই পরীক্ষিত দেশপ্রেমিক।
হয়তো নীতিনির্ধারকরা তাকে পাশ কেটে চলে যেতে পারেন; কিন্তু এই যাত্রার কোন অজুহাত তারা শেষ বিচারে দেখাতে পারবেন না!
অর্থাৎ চোখের দিকে তাকিয়ে কথা না বলতে পারা ভীতু আইজিপিকে সরিয়ে যদি আবার কোন এই জাতীয় ব্যক্তিকে তারা ক্ষমতায়ন করেন; সে ক্ষেত্রে অসম্ভব কঠোর পরিণতি তাদের নিকট ভবিষ্যতে নিতেই হবে!
