অগ্নিদগ্ধ বসত আর অশ্রুসিক্ত প্রতিবাদের ইতিকথা

রফিকুল ইসলাম রানা
নদীর ধারে সে ই ভাঙা কাঠের পুলটা আজও সাক্ষী হয়ে আছে । ওপারে পৌরশহরের ক্ষমতার দম্ভ আর এপারে হাজিপুর ইউনিয়নের মাটির মানষেুষের বকু ফাটা হাহাকার। সেই হাহাকার আজ এক নিহত নেতার বিচার চেয়ে সহকর্মীর কণ্ঠে আর্তনাদ হয়ে ফিরে এসেছে । এ শুধু মামলা-মোকদ্দমার হিসেব নয়, এ হলো সাইফুল ইসলাম সরকার নামের এক মাওলানা টাইপের সাধারণ মানুষের, যিনি কিনা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে এক অসম যুদ্ধে নিজেকে সোপে দিয়েছিলেন।
সাধারণের গুরু, জনতার নেতা সাইফুল ইসলাম সরকার প্রথমে শ্রমিক নেতা ছিলেন না; ছিলেন সাধারণ ঘরের একজন মুন্সী বা মাওলানা। কিন্তু চোখ থাকতে কি আর দেখা যায় না? ২০০০ সালের সেই সময়টাতে তিনি দেখলেন, কীভাবে পার্শ্ববর্তী সদর থানার তৎকালীন মেয়র হাতমউদ্দিন সরকার-এর ছত্রছায়ায় থাকা বহিরাগতরা হিন্দুও নিম্নবিত্ত মানুষের উপর চাঁদা দাবি করে ফলমূল কেড়ে নেয় আর নির্লজ্জভাবে হেনস্থা করে ।
সহকর্মী তাঁর নেতার কথা বলতে গিয়ে ক্ষোভেভ ফেটে পড়েন—”একটা ইমাম সাহেব রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলেন…তাঁকে ধরে বলল, ‘দাঁড়িয়ে পেশাব করেছিস, দে পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা!'”। ইমামের বেতন মাত্র তিন-চার হাজার,সে কীভাবে দেবে এই আকাশছোঁয়া জরিমানা? নেতা দেখলেন, এই জলুমের মদতদাতা আর কেউ নয়, সেই সময়ের ইউসুফ খান পিন্টু নামের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাবানরা।
প্রতি বাদের মলূ্য: আগুন আর মামলার পাহাড় সাইফুল ইসলাম সরকার যখন এই শোষণে বাঁধা দিতে চাইলেন, তখন শুরু হলো প্রতি হিংসার পালা। “উনি যখন বাধা সৃষ্টি
করছে , তখন আস্তে আস্তে …,” সহকর্মী কেঁপে ওঠেন, “তখনই উনারে বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমায় জড়ানো হলো।” ২০০০ সালের সেই আওয়ামী লীগ সরকারে র আমলে তাঁর ও তাঁর সাত-আটজন সহকর্মী র নামে প্রায় ২০-২৫টি মামলা ঠুকে দেওয়া হলো।
মামলাই শেষ নয়। প্রতিরোধ করতে গিয়ে তাঁরা সব হারালেন। বাজারের সব দৈনন্দিন কাজ করতে গিয়ে ও তাঁরা ওই বহি রাগতদের রোষানলে পড়তেন।
সবচেয়ে করুণ দৃশ্যটি বর্ণনা করতে গিয়ে গলা বুজে আসে সহকর্মীর: “আমাদের বাড়ি ঘর যা আছে সব… সবার বাড়ি ঘর ভাঙচুর করে একটা পানির খাওয়ার গ্লাসও রাখে নাই। সব আগুন দিয়ে পুড়ি টুরি “। ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে , মামলা দিয়ে , জীবনকে নরক বানিয়ে দেওয়া হলো। শহর থেকে আসা এই বহিরাগতদের নির্যাতন শুধু শহরে ই নয়, নদীর ওপারে ইউনিয়ন পরিষদে ও চলত। হাহাকার এবং শেষ আবেদন নেতা তাঁর সাধারণ জীবন ছেড়ে মানুষের জন্য নেমে এসেছিলেন, আর বিনিময়ে পেলেন শুধু নির্যাতন, অপমান ও শেষ পর্যন্ত মৃত্যু। সহকর্মী র সে ই আর্জি আজ বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে : “বিচার সম্পর্কে তো প্রতিটা বইয়ে এই সংবাদে অনেক কিছু বলা আছে । আরও আমার কাছে কিছু ডকুমেন্ট আছে আমি সবগুলি দেব”। তাঁর এই কথাগুলি প্রমাণ করে , এই মৃত্যু যেন কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বছরের পর বছর ধরে চলা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও অত্যাচারের এক করুণ পরিণতি ।
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন: “আল্লাহই তো এইভাবে মানষুকে হে নস্তা করতে বলে নাই।” তাঁর এই আক্ষেপ, তাঁর
এই আবেদন—সাইফুল ইসলাম সরকারের এই আত্মত্যাগ যেন ব্যর্থ না হয়। সাধারণ মানুষের উপর হওয়া জুলুমের
মদতদাতা ও বহিরাগতদের শাস্তি হোক। এক নিহত নেতার বিচার, তাঁর সহকর্মীর হৃদয়ের সমস্ত অশ্রু ও ক্রোধ নিয়ে
আজও বিচারকের দরজায় আঘাত করছে।
