কুঁড়েঘরের এক বিকেল

– অধ্যাপক ডাঃ শাহনাজ জাহান

শীত তখনো পুরোপুরি বিদায় নেয়নি, আবার বসন্তও এসে পৌঁছায়নি নিশ্চিত ভরসায়। দিনের আলোয় রোদের উষ্ণতা, কিন্তু ছায়ায় দাঁড়ালে অচেনা এক শীতলতা শরীর ছুঁয়ে দেয়। প্রকৃতি নিজেই বুঝি এসময় দ্বিধান্বিত হয়–থাকব, না যাব; আসব, নাকি আর একটু অপেক্ষা করব।

দোতলা বাড়ির বারান্দায় বসে আছেন প্রৌঢ়বয়সী সালমা জাহান, স্কুলশিক্ষিকা। পুরোনো শহরের এই বাড়িটিতে একসময় তাঁর সংসার গড়ে উঠেছিল; স্বামীর সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর ছায়া এখনও মিশে আছে প্রতিটা দেয়াল জুড়ে। বিকেলটা বেশ শান্ত আজ। বাড়ির সামনের গলিতে রিকশার টুংটাং, দূরে কোথাও ট্রামের মৃদু শব্দ, আর মাঝে মাঝে পাশের বাড়ির ছাদে শুকনো কাপড়ের সংগে বাতাসের আলাপচারিতার অস্পষ্ট কুঞ্জন।

চায়ের কাপে চুমুক দিলেন তিনি। এক কাপ চা প্রায় ঘন্টাখানেক সময় নিয়ে শেষ হয় তার, কখনোবা আরো বেশিক্ষণ। স্বচ্ছ কাপের ওই চা টুকু পাশে থেকে একাকীত্বের ভার কিছুটা লাঘব করে হয়তো। শেষ বিকেলের এক চিলতে রোদ এসে পড়ছে কোলের ওপর, কিন্তু সেই আলোয় উষ্ণতা ছিল না–ছিল স্মৃতির মতো শান্ত ঔদাসীন্য।

হঠাৎ যেন বাতাসে ভেসে এলো চেনা এক গন্ধ। মনে হল ঠিক যেন রোদের তাপে শুকিয়ে যাওয়া মাটির উষ্ণতার ঘ্রাণে কাঁচা ধানের হালকা মিষ্টি সুবাস আর সরিষা ফুলের তীক্ষ্ণ কোমল ঝাঁঝ–যে ঝাঁঝ চোখে জল আনে না, বরং বুকের ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা করে দেয়।

কদিন পর পুজার ছুটি। ভাবছেন, এবার সবাইকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি যাবেন।

সালমার দুই ছেলে- একজন ইঞ্জিনিয়ার, আরেকজন ডাক্তার। দু’জনেই দূরদেশে, নিজেদের সংসারে, নিজেদের আকাশে প্রতিষ্ঠিত। একমাত্র মেয়েটি এই শহরেই- তারও নিজের ঘর, সন্তান, দায়িত্ব, সব মিলিয়ে ভীষন ব্যস্ততা। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন নিঃশব্দ এক প্রান্তরে। স্বামী চলে যাওয়ার পর, আত্মীয়স্বজন আর কাজের লোকজন মিলিয়ে দিন বেশ ভালোই কেটে যায়। অভাব নেই কোন, অভিযোগও নেই, শুধু এক ধরনের নীরবতা এঘর-ওঘর পায়চারি করতে থাকে।

পূজার ছুটিতে মেয়ে, জামাই আর নাতি-নাতনিতে সালমার ঘর ভরে উঠল। আবদার, আদর, ছুটোছুটি, অভিযোগ, বায়না, কতকিছু।

—“নানু, পিঠা বানাও।” —“পায়েস করো।” —“গল্প বলো।” – “আম্মু-বাবাকে বকে দাও তো।”

ছোট ছোট হাত এসে বারবার তাঁর শাড়ির আঁচল জড়িয়ে ধরছিল, নাক ঘেঁষে আদর চাইছিল। হাসছিলেন তিনি- কিন্তু সেই হাসির গভীরে ছিল একটুকরো দীর্ঘশ্বাস, কি যেন নেই, কিছুটা শুন্যতা, যা কেউ টের পেত না।

পরদিন সবাই মিলে গ্রামের বাড়ির পথে রওনা হল। চওড়া মাটির রাস্তা, দু’পাশে দুলতে থাকা ধানক্ষেত, সরিষার হলুদ ঢেউ, দূরে দূরে মাটির ঘর, মাঝে মাঝে আধাপাকা দালান। বাচ্চারা থামছিল- গাছ দেখে, ফুল দেখে, বুনো ফল দেখে, মাটির ঘর দেখে বিস্ময়ে। কত প্রশ্ন- “এই ফুলটার নাম কী?” এটা কি গাছ?” গ্রাম তাদের কাছে ছিল এক নতুন কবিতা।

বহুবছর পর গ্রামের বাড়িটি নাতি-নাতনির কোলাহলে যেন প্রাণ পেলো, উঠোন জেগে উঠল, রান্নাঘরে আগুনের শব্দ, হাঁড়ির ঢাকনার শব্দ, হাসির শব্দ, পায়ের শব্দ। পেয়ারা-লিচু-ডালিম আম-কাঠাল, শিউলি-বকুল হলুদ-সবুজ ঘাস -সবার কত গল্প যেন জমে ছিলো, বৃদ্ধা ছুঁয়ে ছুঁয়ে সব শুনলেন। শব্দে নয়, বাক্যে নয়, যেন স্পর্শে স্পর্শে ভরে উঠছে মন। কানে কানে ফিসফিস করে কিছু শোনাতে চাইছে স্মৃতির ডায়েরি।

খাওয়া-দাওয়া শেষে একটু জিরিয়ে নিতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। তিনি বললেন, -“চলো, মাঠে একটু হাঁটি, কুঁড়েঘরটাও দেখে আসি”

বাড়ির সামনেই, একটু খোলা প্রান্তরে, মাটির গন্ধমাখা, খড়ের চালের নিচে ছোট্ট এক আশ্রয়। কুৃঁড়েঘর, ধানক্ষেত আর সরিষাক্ষেতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃশব্দ স্মৃতিঘর। একসময় শখ করে বানানো। স্বামী চলে যাওয়ার পর আর আসা হয়নি।

মাঠে বাচ্চারা ছুটোছুটি করছে। মেয়ে-জামাই ও ওদের আনন্দে শামিল। হৈ-হুল্লোড়ে উচ্ছ্বসিত নিশ্চিন্ত ছেলেবেলার গল্পগুলো ফ্রেমবন্দী করছে ওদের মা-বাবা। বাচ্চাদের সংগী হয়েছে এ পাড়ার বেশ কিছু কাছাকাছি বয়সের ছেলেমেয়ে। প্রকৃতি যেন তার রহস্যময় খেলায় খুব সহজেই বন্ধুত্ব গড়ে দিলো ভিন্ন বসতির দু’দালের মাঝে।

তিনি কুঁড়েঘরের কাঠের বেঞ্চিতে বসে পড়লেন। চারদিকটা ঠিক আগের মতোই। বসন্তের আগমনী বার্তা, মিষ্টিরোদ, আলো-হাওয়া, খেতের দোলা–সব আছে। শুধু পাশের জায়গাটা ফাঁকা।

তিনি আর তাঁর স্বামী পাশাপাশি বসতেন এখানে। চুপচাপ, কথা বলার প্রয়োজন হতো না। বাতাস কথা বলত, পাখিরা কথা বলত, ক্ষেতের ঢেউ কথা বলত। তাঁর স্বামী হাতটা এমনভাবেই ধরতেন–কথা না বলেও সব বলা হয়ে যেতো। যেন কোন স্বপ্ন নিয়ে নয়, কোন চাহিদা নয়, কোন উচ্চারণও নয়–ছিলো শুধু পাশে থাকার দাবি।

আজ তাঁর হাতটা নিজের কোলেই রাখা। পাশে বসে বিস্ময়ে তাকানোর চোখ নেই। অথচ কি ভীষন জীবন্ত সেই অনুভূতি। মনে হলো, যদি একটু পরেই পাশ থেকে কেউ বলে ওঠে— “ঠান্ডা লাগছে? আঁচলটা টেনে নাও তো।”

কথাটা শোনা গেল না। শুধু বাতাসটা একটু জোরে বয়ে গেল।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। খেলা শেষে ক্লান্ত নাতনী এসে বসলো পাশে, কোলে মাথা রাখলো। ছোট্ট নরম হাতের আঙুল গুলো সালমার ডান হাতের ভেতর। সালমার স্হির মলিন দৃষ্টি দূর দিগন্তে, অস্তিত্বে-অনুভবে টের পেলেন দৃঢ়তা মেশানো স্বামীর হাত, যে হাতের স্পর্শে-স্পন্দনে একদিন তাঁর গোটা সংসার প্রানবন্ত ছিল। সে হাত যেন পরম মমতায় ছুঁয়ে দিয়ে গেলো আঙুলের ভাঁজের নির্জীব স্বপ্নগুলো। সালমা নাতনির চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন।

–”নানু, আজকে থাকবো আমরা?”

চোখ নামিয়ে তাকিয়ে হাসলেন। কিছু বললেন না। ভারী হয়ে ছিলো চোখের পাতা। কিছু শোক আছে–যা হৃদয়ের ভেতর নীরবে জ্বলে থাকে প্রদীপের মতো; অন্ধকারে পথের দিশা হয়ে। সে আলোর তীব্রতা কমিয়ে দিতে পারে না চোখের নোনাজলের সমুদ্র।

মেয়ে, জামাই এসে বললো, -”ঘরে চলো আম্মু।” -”চলো।”

বেঞ্চি থেকে উঠে হাঁটছিলেন বাড়ির পথে। কিছু কি রেখে গেলেন! কয়েক পা এগিয়ে মনে হলো তাকে ডাকছে কেও, পেছন ফিরে তাকালেন। পলকহীন চোখে দৃষ্টির গভীরে কুঁড়েঘরের আবছা ছায়ায় ভেসে উঠলো স্বামীর মুখখানি। ফিরে না যাবার দুর্নিবার এক আকাংখা, অবাধ্য আবেগ যেন আটকে দিচ্ছে পা দুটো।

মেয়ের ডাক কানে এল। বুকের ভেতর ভীষন এক শুন্যতা আর অভিমানের ঢেউ চোখে নিয়ে নিরবে সামনে এগুলেন।

কুঁড়েঘরের বিকেলটা জানত– কিছু প্রেম কথা বলে না, কোনো উচ্চারণ নেই, অভিযোগ নেই। শুধু স্মৃতির আলো হয়ে নিঃশব্দ এক পবিত্রতায় সাহস জোগায়, বাঁচিয়ে রাখে।

(লেখাটি সিবি২৭ ব্যাচের জন্য উৎসর্গকৃত—১৯/০১/২০২৬)

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *