জব্দ তালিকার সাক্ষীরা পালিয়ে গেছে? চার্জশিটে ‘ভুতুড়ে সাক্ষী’র আবির্ভাব!
মো: শহীদুল ইসলাম

মামলার ‘জন্মসনদ’ হিসেবে পরিচিত জব্দ তালিকায় যাদের নাম সাক্ষী হিসেবে জ্বলজ্বল করছে, আদালতে দাখিলকৃত অভিযোগপত্রে (চার্জশিট) তাদের নাম-গন্ধও নেই! আবার জব্দ তালিকায় যার কোনো অস্তিত্বই ছিল না, চার্জশিটে তাকেই বানানো হয়েছে ১ নম্বর সাক্ষী। ময়মনসিংহ কোতোয়ালী মডেল থানায় দায়েরকৃত চাঞ্চল্যকর অস্ত্র ও মাদক মামলায় এমনই এক নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনা দালিলিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
সাংবাদিক শেখ মেহেদী হাসান নাদিম ও ব্যবসায়ী মোঃ শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলায় (জিআর ৮৪৩ ও ৮৪৪) দীর্ঘ ৮ মাস পর পুলিশ যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তা হাতে পাওয়ার পর বেরিয়ে এসেছে তদন্ত প্রক্রিয়ার ভয়াবহ অসঙ্গতি। অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দিতেই গত আগস্ট মাসে গোপনে আদালতে এই ত্রুটিপূর্ণ চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছিল, যা আজ ডিসেম্বরে উন্মোচিত হলো।
সাক্ষী বদলের ‘ম্যাজিক’: রমজান হলেন রাকাত!
মামলার নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ রাতে মাসকান্দা এলাকায় অভিযানের সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ যে জব্দ তালিকা প্রস্তুত করে, তাতে সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেন স্থানীয় বাসিন্দা ১। মোঃ রমজান আলী এবং ২। মোঃ এমদাদুল হক। ফৌজদারি আইন অনুযায়ী, আলামত উদ্ধারের সত্যতা প্রমাণের জন্য এই জব্দ তালিকার স্বাক্ষরকারী সাক্ষীরাই আদালতের প্রধান ভরসা।
অথচ, দীর্ঘ তদন্ত শেষে অস্ত্র মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই পিন্টু কুমার রায় (অভিযোগপত্র নং ৭৯৯, তাং ৩১/০৮/২৫) এবং মাদক মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই অংকন সরকার (অভিযোগপত্র নং ৭১৫, তাং ১৭/০৮/২৫) আদালতে যে প্রতিবেদন দাখিল করেন, সেখানে এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে। অভিযোগপত্রের ৫ নম্বর কলামে সাক্ষী তালিকা থেকে জব্দ তালিকার স্বাক্ষরকারী রমজান ও এমদাদুলকে সম্পূর্ণ গায়েব করে দেওয়া হয়েছে।

তাদের পরিবর্তে ১ নম্বর সাক্ষী হিসেবে আকাশ থেকে আমদানি করা হয়েছে ‘মাঈনুল হাসান খান রাকাত’ নামক এক ব্যক্তিকে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, ঘটনাস্থলে প্রস্তুতকৃত জব্দ তালিকার কোথাও এই ‘রাকাত’-এর নাম বা স্বাক্ষর নেই।
জনমনে প্রশ্ন: জব্দ তালিকার সাক্ষীরা কি পালিয়ে গেছেন? নাকি পুলিশ জেনেশুনেই তাদের বাদ দিয়েছে কারণ তারা মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে রাজি হননি? আর যে ব্যক্তি (রাকাত) ঘটনাস্থলে সই করলেন না, তিনি ৮ মাস পর ১ নম্বর সাক্ষী হলেন কীভাবে? এটি স্পষ্টত দণ্ডবিধির ১৯৩ ধারার অপরাধ (মিথ্যা সাক্ষ্য সৃষ্টি)।
উদ্ধার ‘শূণ্য’, তবুও আসামি ব্যবসায়ী শহিদুল!
মাদক মামলার (জিআর ৮৪৪) চার্জশিট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৩ নম্বর আসামি হিসেবে ব্যবসায়ী মোঃ শহিদুল ইসলাম (৫০)-কে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অথচ, ঘটনার দিন প্রস্তুতকৃত জব্দ তালিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, শহিদুল ইসলামের দেহ বা দখল থেকে কোনো মাদক, অস্ত্র বা অবৈধ বস্তু উদ্ধার হয়নি।
আইনজীবীদের প্রশ্ন—যার কাছ থেকে কিছুই উদ্ধার হলো না এবং জব্দ তালিকায় যার নামের পাশে কোনো আলামত নেই, তাকে কিসের ভিত্তিতে মাদক ব্যবসায়ী সাজানো হলো? তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই অংকন সরকার তাকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৪১ ধারায় (সহায়তা) অভিযুক্ত করেছেন, যা সম্পূর্ণ অনুমাননির্ভর এবং হয়রানিমূলক।
লুকোচুরির খেলা: আগস্টের চার্জশিট ডিসেম্বরে কেন?
নথিপত্রে দেখা যাচ্ছে, পুলিশ গত ১৭ আগস্ট (মাদক মামলা) এবং ৩১ আগস্ট (অস্ত্র মামলা) আদালতে গোপনে চার্জশিট দাখিল করে। কিন্তু আসামিপক্ষকে দীর্ঘ ৪ মাস অন্ধকারে রাখা হয়। ডিসেম্বরে এই নথি হাতে পাওয়ার পরই সাক্ষী বদলের এই জালিয়াতি ধরা পড়ে। অভিযোগ উঠেছে, সাজানো সাক্ষীদের প্রস্তুত করতেই এই সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে।

ঘরের শত্রু বিভীষণ: রহস্যময় ২য় আসামি ‘কালাম’
মামলার ২ নম্বর আসামি মোঃ কালাম সিকদার-এর ভূমিকা নিয়েও উঠেছে সন্দেহের ঝড়। পুলিশি নথিতে তার বর্তমান ঠিকানা দেখানো হয়েছে ১ নম্বর আসামি মেহেদী হাসান নাদিমের বাসা। জব্দ তালিকা অনুযায়ী, অভিযানের সময় একমাত্র কালামের পকেট থেকেই ১৬০ পিস ইয়াবা উদ্ধার দেখানো হয়েছে।
চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার মাত্র ৩০ মিনিটের মাথায় এই কালাম সিকদার পালিয়ে যায় এবং বর্তমানে পলাতক রয়েছে। আইনজীবীদের মতে, কালামই ছিল এই নাটকের মূল ‘খলনায়ক’ বা পুলিশের ‘সোর্স’। ১ নম্বর আসামিকে ফাঁসানোর জন্য কালামের মাধ্যমেই বাসায় অস্ত্র ও মাদক ‘প্ল্যান্ট’ (Plant) করা হয়েছিল কি না, তা এখন বড় প্রশ্ন। তার পলায়নই তার অপরাধের সবচেয়ে বড় স্বীকারোক্তি।
আইনজীবীর বক্তব্য আসামী পক্ষের আইনজীবী জানান, “এটি একটি ‘ডকুমেন্টারি ফ্রড’ (দালিলিক জালিয়াতি)। জব্দ তালিকায় সাক্ষী ‘ক’, আর চার্জশিটে সাক্ষী ‘খ’—পৃথিবীর কোনো আইনে এমন চার্জশিট টিকতে পারে না। আমরা আদালতে এই দালিলিক অসঙ্গতি তুলে ধরে অবিলম্বে এই প্রহসনের মামলা থেকে আসামিদের অব্যাহতির (Discharge) আবেদন জানাব।”
