জীবন কাহিনী: পর্ব ১‘অডুবন্ত নারী’: ভায়োলেট জেসপের অবিশ্বাস্য জীবনকাহিনী

ভায়োলেট জোসেপ। ফাইল ছবি

গবেষনা ও সম্পাদনা @শামীম আহমেদ

প্রকাশ:৯ ই সেপ্টেম্বর ২০২৫ইং ১১:৩৮

ভূমিকা: যমদূত যক্ষার কাছে পরাজিত ডাক্তাররা রায় দিয়েছিলেন, ছোট্ট মেয়েটির আয়ু আর মাত্র কয়েক মাস। কিন্তু নিয়তির চিত্রনাট্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে ভায়োলেট জেসপকে শৈশবে মৃত্যু ছুঁতে পারেনি, যৌবনে উত্তাল সমুদ্রের বুকে তিন-তিনটি জাহাজ ডুবির সহযোগিতা নিয়েও যমদূত তাকে নিতে পারেনি।
আরএমএস অলিম্পিকের সংঘর্ষ, ইতিহাসের সাক্ষী হওয়া টাইটানিকের হিমশৈলে ধাক্কা, এবং বিশ্বযুদ্ধের দামামায় হাসপাতাল জাহাজ ব্রিটানিকের সলিলসমাধি – এই তিনটি মহাদুর্যোগ থেকেই অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছিলেন তিনি। তার এই অবিশ্বাস্য জীবনকাহিনীর কারণেই তিনি ইতিহাসে পরিচিত ‘মিস আনসিঙ্কেবল’ বা ‘অডুবন্ত নারী’ হিসেবে। চলুন, ফিরে দেখা যাক সেই অদম্য নারীর জীবন।
প্রারম্ভিক জীবন ও কর্মজীবনের শুরু: ভায়োলেট জেসপ ১৮৮৭ সালে আর্জেন্টিনায় আইরিশ অভিবাসী বাবা-মায়ের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় তিনি যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হন এবং ডাক্তাররা তার বেঁচে থাকার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই যাত্রায় তিনি মৃত্যুকে পরাজিত করেন, যা ছিল তার ভবিষ্যৎ জীবনেরই এক পূর্বাভাস।
বাবার মৃত্যুর পর তার মা জাহাজে স্টুয়ার্ডেস (যাত্রীসেবিকা) হিসেবে কাজ শুরু করেন। মায়ের অসুস্থতার কারণে পরিবারের দায়িত্ব নিতে মাত্র ২১ বছর বয়সে ভায়োলেটকেও একই পেশায় আসতে হয়। ১৯০৮ সালে তিনি রয়্যাল মেইল লাইনের জাহাজে কাজ শুরু করেন এবং পরে হোয়াইট স্টার লাইনে যোগ দেন, যে সংস্থাটি অলিম্পিক-শ্রেণীর বিলাসবহুল জাহাজের জন্য বিখ্যাত ছিল।
প্রথম দুর্ঘটনা: আরএমএস অলিম্পিক (১৯১১) ভায়োলেটের কর্মজীবনের প্রথম বড় দুর্ঘটনাটি ঘটে ১৯১১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। তিনি তখন আরএমএস অলিম্পিক জাহাজে কর্মরত ছিলেন, যা ছিল টাইটানিকের ‘বোন জাহাজ’। ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস হকের সাথে অলিম্পিকের সংঘর্ষে দুটি জাহাজই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সৌভাগ্যবশত, অলিম্পিক ডুবে না গিয়ে বন্দরে ফিরে আসতে সক্ষম হয়। ভায়োলেট এবং জাহাজের অন্য যাত্রীরা সেবার বেঁচে যান। এই ঘটনাটি তার জীবনের প্রথম সতর্কবার্তা ছিল, কিন্তু তিনি এতে দমে যাননি।
দ্বিতীয় ও সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা: আরএমএস টাইটানিক (১৯১২) ১৯১২ সালের ১০ এপ্রিল, ভায়োলেট জেসপ ২১ বছর বয়সী একজন স্টুয়ার্ডেস হিসেবে যোগ দেন ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত জাহাজ, আরএমএস টাইটানিকে। তিনি প্রথমে এই জাহাজে কাজ করতে দ্বিধাবোধ করছিলেন, কিন্তু বন্ধুদের উৎসাহে রাজি হন।
১৪ এপ্রিল রাতে টাইটানিক একটি আইসবার্গের সাথে ধাক্কা খায়। দুর্ঘটনার সময় ভায়োলেট ডেকে উঠে আসেন এবং জাহাজের কর্মকর্তাদের নির্দেশ মতো অন্য যাত্রীদের লাইফবোটে উঠতে সাহায্য করেন। তিনি স্মৃতিচারণায় বলেছেন, তাকে লাইফবোট ১৬-তে ওঠার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং এক কর্মকর্তা তার কোলে একটি শিশুকে ধরিয়ে দিয়ে বলেন তার যত্ন নিতে। কনকনে ঠাণ্ডা আর অন্ধকারের মধ্যে ভায়োলেট সেই শিশুটিকে আঁকড়ে ধরে বসেছিলেন। দীর্ঘ আট ঘণ্টা পর উদ্ধারকারী জাহাজ আরএমএস কার্পেথিয়া তাদের উদ্ধার করে। জাহাজে ওঠার পর এক নারী ছুটে এসে তার কোল থেকে শিশুটিকে নিয়ে যায়, যিনি ছিলেন শিশুটির মা।
তৃতীয় দুর্ঘটনা: এইচএমএইচএস ব্রিটানিক (১৯১৬) প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে টাইটানিকের অন্য ‘বোন জাহাজ’ ব্রিটানিককে হাসপাতাল জাহাজে রূপান্তরিত করা হয়। ভাগ্যের কী পরিহাস, ভায়োলেট জেসপ এবার একজন নার্স হিসেবে যোগ দেন এই জাহাজে।
১৯১৬ সালের ২১ নভেম্বর সকালে গ্রিসের কাছে এজিয়ান সাগরে একটি মাইন বিস্ফোরণে ব্রিটানিক দ্রুত ডুবতে শুরু করে। টাইটানিকের চেয়েও দ্রুত, মাত্র ৫৫ মিনিটের মধ্যে জাহাজটি ডুবে যায়। ভায়োলেট এবং অন্য যাত্রীরা লাইফবোটে করে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু জাহাজের প্রপেলারের টানে তাদের লাইফবোটটি ডুবে যেতে থাকে। শেষ মুহূর্তে ভায়োলেট নৌকা থেকে লাফ দেন এবং তার মাথা জাহাজের নিচে সজোরে ধাক্কা খায়। মারাত্মক আঘাত পেলেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান। বহু বছর পর তিনি জানতে পারেন, সেই দুর্ঘটনায় তার মাথার খুলি ফেটে গিয়েছিল।
শেষ জীবন: তিন-তিনটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা সত্ত্বেও ভায়োলেট সমুদ্রকে ভয় পাননি। তিনি তার ৪২ বছরের কর্মজীবনে সমুদ্রযাত্রা অব্যাহত রাখেন। অবশেষে, তিনি ইংল্যান্ডের সাফোক-এ অবসর জীবন কাটান, যেখানে তিনি মুরগি পালন এবং বাগান করতে ভালোবাসতেন। ১৯৭১ সালে ৮৩ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এই ‘অডুবন্ত নারী’ মৃত্যুবরণ করেন।
উপসংহার: ভায়োলেট জেসপের জীবন কেবল ভাগ্য বা অলৌকিকতার গল্প নয়, এটি সাহস, সহনশীলতা এবং প্রতিকূলতার মুখে টিকে থাকার এক অসাধারণ অনুপ্রেরণা। যে নারী শৈশবে রোগ এবং যৌবনে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ তিনটি সামুদ্রিক দুর্ঘটনাকে হার মানিয়েছেন, তার কাহিনী যুগ যুগ ধরে মানুষকে বিস্মিত করে যাবে।

(আগামী সপ্তাহে পড়ুন আরেক বিস্ময়কর জীবনের গল্প।)

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *