সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনায় মালেতে সার্কের আঞ্চলিক বৈঠক; সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক

দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক (মেরিন ফিন ফিশ) মাছের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং এ খাতে আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে দুই দিনব্যাপী সার্ক আঞ্চলিক পরামর্শ সভা শুরু হয়েছে। বুধবার (১ জুলাই) থেকে শুরু হওয়া এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সভায় সার্কভুক্ত দেশগুলোর নীতিরির্ধারক, জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা, গবেষক এবং উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।

যৌথভাবে এই উচ্চপর্যায়ের সভার আয়োজন করেছে সার্ক এগ্রিকালচার সেন্টার (এসএসি), মালদ্বীপের মৎস্য, কৃষি ও মহাসাগরীয় সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলভিত্তিক অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘সুশীলন’।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় মৎস্য খাতের গুরুত্ব

সভার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মালদ্বীপের মৎস্য, কৃষি ও মহাসাগরীয় সম্পদ মন্ত্রণালয়ের স্টেট মিনিস্টার মোহাম্মদ মুথথালিব। তিনি মৎস্যসম্পদ রক্ষার ওপর জোর দিয়ে বলেন—

“দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব মোকাবিলায় মৎস্য খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিশাল সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষা করতে হলে আমাদের সবাইকে একক চিন্তার বাইরে এসে টেকসই সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার হাত আরও বাড়াতে হবে।”

সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘দক্ষিণ এশিয়ায় সামুদ্রিক পাখনাযুক্ত মাছ: বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতি ও সহযোগিতার সম্ভাবনা’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ (Keynote Paper) উপস্থাপন করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মৎস্যবিজ্ঞানী ও বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল ওহাব। তিনি এই অঞ্চলের মৎস্য খাতের প্রধান সংকটগুলো চিহ্নিত করে বলেন:

  • অতিরিক্ত আহরণ: অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরার ফলে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
  • আইইউইউ (IUU) মৎস্য আহরণ: অবৈধ, প্রতিবেদনবিহীন ও অনিয়ন্ত্রিত মৎস্য আহরণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে, যা আইনি কাঠামোর বড় চ্যালেঞ্জ।
  • পরিবেশগত বিপর্যয়: জলবায়ু পরিবর্তন এবং সামুদ্রিক আবাসস্থলের অবক্ষয় দক্ষিণ এশিয়ার মৎস্যসম্পদের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলছে।

ড. ওহাব আরও উল্লেখ করেন যে, এই বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক সমস্যাগুলো একক কোনো দেশের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়, তাই একটি সমন্বিত আঞ্চলিক ফ্রেমওয়ার্ক গড়ে তোলা একান্ত জরুরি।

বিশেষায়িত প্ল্যাটফর্ম গঠনের দাবি

নেপালে অবস্থিত সার্ক সচিবালয়ের পরিচালক (এআরডি ও এসডিএফ) তানভীর আহমেদ তরফদার বলেন, টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনা, যৌথ বৈজ্ঞানিক গবেষণা, সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজন (Value Addition) এবং এই শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সার্ক দেশগুলোর সম্মিলিত অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন।

সভায় স্বাগত ও উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন সার্ক এগ্রিকালচার সেন্টারের পরিচালক ড. মোঃ হারুনূর রশীদ। তিনি মৎস্য খাতের কৌশলগত রূপরেখা তুলে ধরে বলেন—

“বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পাখনাযুক্ত মাছের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান করতে হবে। এক্ষেত্রে সার্ক কৃষি কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনায় একটি ‘বিশেষায়িত সামুদ্রিক ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম’ গঠন করা এখন সময়ের দাবি।”

উপকূলীয় জীবিকা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়

বাংলাদেশের অন্যতম বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘সুশীলন’-এর প্রধান নির্বাহী মোস্তফা নুরুজ্জামান তাঁর বক্তব্যে বলেন, সামুদ্রিক পাখনাযুক্ত মাছ কেবল বাণিজ্যের মাধ্যম নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্য নিরাপত্তা, লাখ লাখ উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে। তাই এ সম্পদের সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহারে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।

অনুষ্ঠানটির সমন্বয়কারী এবং ঢাকায় অবস্থিত সার্ক এগ্রিকালচার সেন্টারের সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট (মৎস্য) ড. মো. শরীফুল ইসলাম সভার মূল উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, এই পরামর্শ সভার মূল লক্ষ্য হলো সার্ক সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আধুনিক জ্ঞান ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বিনিময়, নীতিনির্ধারণী সংলাপ এবং যৌথ গবেষণা ও উন্নয়নের অগ্রাধিকার ক্ষেত্রগুলো (Priority Areas) সঠিকভাবে চিহ্নিত করা।

দুই দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক পরামর্শ সভায় সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের টেকসই আহরণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা জোরদারকরণ, নীতি সমন্বয় এবং সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিভিন্ন কৌশলগত দিক নিয়ে বিস্তারিত রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *