ধানের জমিতে পানি নেই, সেচযন্ত্র নিয়ে ফিলিং স্টেশনে ছুটছেন চাষিরা

মোহাম্মদ উল্যা

রাজশাহী অঞ্চলে তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে বোরো ধানের সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ডিজেল না পেয়ে নিরুপায় কৃষকরা তাঁদের শ্যালোমেশিন (সেচযন্ত্র) মাথায় করে কিংবা ভ্যানে করে ফিলিং স্টেশনে নিয়ে এসে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করছেন। চাহিদার তুলনায় যৎসামান্য তেল পাওয়ায় ধান ঘরে তোলা নিয়ে বাড়ছে চরম উদ্বেগ।

মাঠে পানি নেই, পাম্পে ভিড়

পবা উপজেলার মাধপপুর কুঠিপাড়ার ৬৫ বছর বয়সী জমেলা বেগম। স্বামী নেই, নিজেই শ্রমিক নিয়ে তিন বিঘা জমিতে বোরো চাষ করেছেন। গত ১০ দিন ধরে তেলের অভাবে সেচ দিতে না পেরে জমি শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর ফিলিং স্টেশন থেকে মাত্র ২০০ টাকার তেল পেয়েছেন তিনি।

জমেলা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, “আগে তিন দিন পরপর পানি দিতাম, এবার ১০ দিনেও পারিনি। কয়েকদিন ঘুরে আজ সামান্য তেল পেলাম।” একই অবস্থা কৃষক রাকিব হোসেনের। তিনি জানান, ২০০ টাকার তেলে মাত্র ৩ ঘণ্টা সেচ দেওয়া যায়, অথচ তাঁর জমিতে অন্তত ৯ ঘণ্টা পানি প্রয়োজন।

চড়া দাম ও তেলের স্বল্পতা

নগরীর বুধপাড়া এলাকার কৃষক আক্কাস আলী জানান, ফিলিং স্টেশনে ডিজেলের সরকারি দাম ১০১ টাকা হলেও বাইরে খোলা বাজারে তা ১৪০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। পাঁচ বিঘা জমিতে সেচ দিতে তাঁর খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, “টাকা দিয়েও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এক বিঘা ধানে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়, এবার তা আরও বাড়বে।”

রাজশাহীর বাগমারা, মোহনপুর ও তানোর উপজেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দেখা গেছে কৃষকদের পাশাপাশি মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ লাইন। পাম্প কর্তৃপক্ষ সীমিত সরবরাহ বজায় রাখতে কৃষকদের নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি তেল দিচ্ছে না।

তীব্র তাপপ্রবাহে বাড়ছে পানির চাহিদা

রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, মার্চ থেকে তাপমাত্রা বাড়ছে। সম্প্রতি ৩৯.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ। তাপমাত্রা বাড়লে জমিতে পানির চাহিদাও বাড়বে, যা সংকটের মাত্রা আরও ঘনীভূত করতে পারে।

কৃষি বিভাগের বক্তব্য

রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. আজিজুর রহমান বলেন, “আমরা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি। যেখানে বিদ্যুৎ আছে সেখানে সেচ সচল রাখা হয়েছে। কৃষকদের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমরা পাম্প মালিক ও প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করছি।”

রাজশাহী অঞ্চলে এবার প্রায় ৩ লাখ ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে জাতীয় খাদ্য মজুতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *