শহীদের বুকে চালানো গুলির মূল্য বা হারানো অস্ত্রের মাশুল আমি দেব না: এটা আমার জবানবন্দি

আমার ভাইয়ের বুকে চালানো গুলির দাম আমি দিব? এই স্পর্ধা বা সাহস আপনাদের কে দিয়েছে? জনগণের টাকায় আর কোনো প্রহসন নয়!ছবি

সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশের ভেরিফায়েড পেজ থেকে ‘লুণ্ঠিত অস্ত্রউদ্ধারের জন্য আর্থিক পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। ৫ সেপ্টেম্বরের সেই বিজ্ঞপ্তিতে পিস্তল বা শটগানের পাশাপাশি যখন ‘চায়না রাইফেল’, ‘এসএমজি’ (সাব-মেশিনগান এবং ‘এলএমজি’ (লাইট মেশিনগান)-এর মতো ভারী সমরাস্ত্রের নাম দেখি, তখন একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আতঙ্কে গা শিউরে ওঠে। ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে একেকটি অস্ত্রের জন্য। কিন্তু এই বিজ্ঞপ্তিটি কেবল অস্ত্র হারানোর সংবাদ নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের মনস্তত্ত্বের একটি ভয়াবহ দলিল।

এই বড় বড় অংক গুলো কে লিখেছেন?
কার পকেট থেকে দিবেন এই বাড়তি জরিমানা? যাদের হুকুম বা অনুমোদনে অস্ত্রাগার থেকে এগুলো বাইরে আনা হয়েছিল তাদের নামের এবং কৃতকর্মের ফিরিস্তি এক কপি আদালেতে আর ফটোকপি জনগনকে দিন!ছবি

উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা কী দেখি? যুক্তরাজ্য, জাপান, নরওয়ে বা নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে পুলিশের মূল দর্শন হলো ‘কমিউনিটি পুলিশিং’। সেখানে একজন পুলিশ অফিসারের প্রধান হাতিয়ার হলো তার প্রতি জনগণের আস্থা, আর প্রয়োজনে লাঠি বা পেপার স্প্রে। দাঙ্গা বা বিশৃঙ্খলা দমনে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড হলো টিয়ার শেল, জলকামান (হট ওয়াটার) বা বড়জোর রাবার বুলেট। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও, যেখানে গান-কালচার প্রবল, সেখানেও অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভে পুলিশকে এলএমজি বা মেশিনগান ব্যবহার করতে দেখা যায় না।
কারণ খুব সহজ—এলএমজি বা এসএমজি হলো যুদ্ধের অস্ত্র। এগুলো সীমান্তে শত্রুর মোকাবিলায় বা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা দেখলাম, পুলিশ ব্যারাকে এলএমজি আর চায়না রাইফেলের মজুদ। প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কি তার নিজের নাগরিকদের ‘শত্রু’ বা ‘যুদ্ধপক্ষ’ মনে করে? যদি তা না হয়, তবে কার বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য নাগরিকদের ট্যাক্সের টাকায় এই ভয়াবহ মারণাস্ত্রগুলো কেনা হয়েছিল?

জুলাই বিপ্লবের প্রতিকী ছবি – জাহান।

পুলিশ বলছে অস্ত্রগুলো ‘লুণ্ঠিত’ বা ‘হারানো’। কিন্তু অস্ত্রাগারের ভল্ট থেকে একটি এলএমজি বা এসএমজি কি একা একা হেঁটে বেরিয়ে এসেছে? থানার মালখানা থেকে একটি সাধারণ গুলি বের করতে গেলেও রেজিস্টার খাতায় এন্ট্রি করতে হয় এবং উর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি লাগে। এত বড় মেশিনগান পকেটে করে ঘোরার বস্তু নয়।
জনগণ হিসেবে আমাদের সাফ প্রশ্ন—কার হুকুমে এই ভারী অস্ত্রগুলো সেদিন বের করা হয়েছিল? সেদিন তো ভিনদেশী কোনো বাহিনী বর্ডার ক্রস করে আক্রমণ করেনি। তবে কি নিজ দেশের নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে দমাতেই এই যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল? যিনি বা যারা এই অস্ত্র বের করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাদের নাম এবং পদবী অবিলম্বে প্রকাশ করতে হবে। তাদের আদালতে দাঁড়িয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে—কোন আইনের বলে তারা সিভিল এরিয়ায় যুদ্ধের অস্ত্র নামিয়েছিলেন।

সবচেয়ে আপত্তিকর বিষয়টি হলো এই পুরস্কারের অর্থ। ঘোষণা করা হয়েছে অস্ত্র ধরিয়ে দিলে লক্ষ লক্ষ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। এই টাকা আসবে কোথা থেকে? রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে? অর্থাৎ, আবারও সেই আমার, আপনার—আমাদের ট্যাক্সের টাকা?
এখানেই আমার ঘোর আপত্তি এবং একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার স্পষ্ট অবস্থান। যে পুলিশ বাহিনী জনগণের টাকায় কেনা অস্ত্র জনগণের নিরাপত্তা না দিয়ে উল্টো জনগণের বুকে তাক করার জন্য বের করেছিল, এবং নিজেদের ব্যর্থতায় তা হারিয়েছে—সেই অস্ত্র খোঁজার খরচ জনগণ বহন করবে না।
রাষ্ট্রীয় কোষাগার কোনো খয়রাতি তহবিল নয় যে, কর্মকর্তাদের ভুল সিদ্ধান্ত আর বিলাসিতার মাশুল সেখানে গুনতে হবে। যেই হুকুমদাতার স্বাক্ষরে অস্ত্র বের হয়েছিল, আজ সেই হুকুমদাতাকেই এককভাবে এই অস্ত্র ফিরিয়ে আনার ‘ফরজ’ দায়িত্ব নিতে হবে। পুরস্কারের প্রতিটি পয়সা ওইসব দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বেতন বা সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে আদায় করতে হবে।

স্বাধীনতাকামীদের দমন পীড়নের লক্ষ্যে রচিত সেই কর্ণওয়ালিশ কোডের পরিবর্তন আজ সময়ের একমাত্র দাবী! এই পুলিশ আমাদের নয়! ছবি – জাহান।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে পুলিশ হবে জনবান্ধব, কোনো দখলদার বাহিনী নয়। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এখন থেকেই। কারণ, গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট দেওয়া নয়, গণতন্ত্র মানে হলো প্রতিটি বুলেটের এবং প্রতিটি পয়সার হিসাব রাখা।
আমার মনোভাব অত্যন্ত পরিষ্কার এবং আপোষহীন—
যে বুলেট আমার ভাইয়ের বুকে চালানো হয়েছে, সেই বুলেটের দাম আমি দেব না। যে অস্ত্র আপনারা জনগনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে গিয়ে হারিয়েছেন, তার জরিমানা বা পুরস্কারের টাকা আমার পকেট থেকে যাবে না। এই দায় এবং দেনা একান্তই আপনাদের।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *