বন, পাহাড় আর হাওর নিয়ে ডাকছে হবিগঞ্জ

হাফিজুর রহমান

হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে আলো-ছায়ার খেলাছবি: 

হবিগঞ্জ

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০: ০০

​পাহাড় ও ছোট ছোট টিলা যেন ঢেউ তোলে মাটির বুকজুড়ে। চা-বাগানের সারি সারি গাছ বাতাসে দোলে ছন্দে ছন্দে। গহিন বনে ছায়া ফেলে শতবর্ষী বৃক্ষ, ডাক পাঠায় অচেনা পাখি। হাওরের জলে খেলে সূর্য। ইতিহাস, প্রকৃতি আর নীরব সৌন্দর্যের মিলনে এক অন্য রকম অনুভবের নাম হবিগঞ্জ। হাওরসমৃদ্ধ এই জেলায় আছে ঐতিহাসিক সাগরদিঘি, উচাইল শংকরপাশা শাহী মসজিদবিথঙ্গল আখড়ার মতো ঐতিহাসিক স্থাপনা। পাহাড়ি বনাঞ্চল রেমা-কালেঙ্গা এবং সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান–এর মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে ছুটে আসেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ।

রেমা-কালেঙ্গা: প্রকৃতির এক অভয়ারণ্য

​দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক পাহাড়ি বনাঞ্চল রেমা-কালেঙ্গা হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলায় অবস্থিত। প্রায় ১ হাজার ৭৯৫ হেক্টর আয়তনের এই বনভূমি বন্য প্রাণী-অভয়াশ্রয় হিসেবে স্বীকৃত। এর ভেতর দিয়ে হাঁটলে দেখা মিলবে ৩৭ প্রজাতির বন্য প্রাণী, ১৬৭ প্রজাতির পাখি এবং ৬৩৮ প্রজাতির গাছপালা। এখানে আধা ঘণ্টা, এক ঘণ্টা ও তিন ঘণ্টার তিনটি ট্রেইল আছে। প্রতিটি ট্রেইল ছবির মতো সুন্দর। বনের ভেতরে আছে একটি সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, যেখান থেকে বনের সবুজ দৃশ্য উপভোগ করা যায়। এখানেই ত্রিপুরা, সাঁওতাল, তেলুগু ও উড়ং সম্প্রদায়ের আদিবাসীদের জীবনধারাও দেখা যেতে পারে।

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলায় অবস্থিত রেমা-কালেঙ্গা বন
ছবি: 

ইতিহাসের সাক্ষী হবিগঞ্জ

সাগরদিঘি: বানিয়াচং উপজেলা সদরে অবস্থিত এই দিঘিটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জলাধার। ৬৬ একর আয়তনের এই দিঘিটির পাড়ে বসেই পল্লিকবি জসীমউদ্‌দীন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘রাণী কমলাবতীর দিঘি’ রচনা করেছিলেন। এটি জেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

উচাইল শংকরপাশা শাহী মসজিদ: ৫০৫ বছরের পুরোনো এই মসজিদটি চুন-সুরকি আর লাল ইটের তৈরি। মসজিদের নকশা এবং ইটের বৈচিত্র্যময় গাঁথুনি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। হবিগঞ্জ সদর উপজেলার উচাইল গ্রামে অবস্থিত এই মসজিদটি পুরাকীর্তিগুলোর মধ্যে যথেষ্ট ভালো অবস্থায় আছে।

বিথঙ্গলের আখড়া: এটি বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম তীর্থস্থান, যা হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার প্রত্যন্ত ভাটি এলাকা বিথঙ্গল গ্রামে অবস্থিত। এর প্রতিষ্ঠাতা রামকৃষ্ণ গোস্বামী ষোড়শ শতাব্দীতে আখড়াটি প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে ২৫ মণ ওজনের শ্বেতপাথরের চৌকি, পিতলের সিংহাসন এবং একটি সোনার মুকুট দেখা যায়।

হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান
ছবি: 

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও অন্যান্য আকর্ষণ

​দেশের ১০টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে সাতছড়ি অন্যতম। এটি জীববৈচিত্র্যে ভরপুর একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল, যা চুনারুঘাটে ৬০০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। এখানে আছে সাতটি ছড়া বা ঝরনা, যার থেকে এর নামকরণ করা হয় সাতছড়ি। এটি প্রায় ২০০ প্রজাতির পাখি এবং ২০০ প্রজাতির বেশি গাছপালার আশ্রয়স্থল।

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলায় অবস্থিত একটি চা–বাগান
ছবি: 

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও অন্যান্য আকর্ষণ

​দেশের ১০টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে সাতছড়ি অন্যতম। এটি জীববৈচিত্র্যে ভরপুর একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল, যা চুনারুঘাটে ৬০০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। এখানে আছে সাতটি ছড়া বা ঝরনা, যার থেকে এর নামকরণ করা হয় সাতছড়ি। এটি প্রায় ২০০ প্রজাতির পাখি এবং ২০০ প্রজাতির বেশি গাছপালার আশ্রয়স্থল।

এছাড়াও, হবিগঞ্জে আছে ২৪টি চা-বাগান, যা দর্শনার্থীদের সহজেই মুগ্ধ করে। মাধবপুরের তেলিয়াপাড়া চা-বাগানে আছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত একটি বুলেট আকৃতির স্মৃতিসৌধ, যেখানে শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতার পঙ্‌ক্তিমালা অঙ্কিত আছে।

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় অবস্থিত তেলিয়াপাড়া বাংলো
ছবি: 

যাতায়াত ও খরচ

​ঢাকা থেকে হবিগঞ্জে সড়কপথ ও রেলপথ—উভয় মাধ্যমেই ভ্রমণ করা যায়।

  • বাসে: নন-এসিতে ৪৫০-৫৫০ টাকা, এসিতে ৭০০-৯০০ টাকা।
  • ট্রেনে: সরাসরি হবিগঞ্জে কোনো স্টেশন না থাকায় শায়েস্তাগঞ্জ পর্যন্ত আসতে হবে। ভাড়া শোভন চেয়ারে ৩০০-৩৫০ টাকা, এসি সিটে ৭০০-৮০০ টাকা। শায়েস্তাগঞ্জ থেকে ৩০-৫০ টাকায় অটোরিকশা বা বাসে করে হবিগঞ্জ যাওয়া যায়।

​(

​হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের লিঙ্ক হলো:

https://www.habiganj.gov.bd/

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *