বটতলী থেকে সিআরবি: পাহাড়ের বুকে ঘুমন্ত ‘পাথরের হাতি’ ও এক বিস্মৃত প্রকৌশলীর খেয়াল (পর্ব-২)

পলিন কাউসার

বটতলী স্টেশনের সেই রাজকীয় আভিজাত্যের ঘোর কাটতে না কাটতেই যদি আপনি সিআরবি (CRB) এলাকার নির্জন পাহাড়ের দিকে পা বাড়ান, তবে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে আরও বড় এক বিস্ময়। পাহাড়ের ঢালে ওটা কী দাঁড়িয়ে আছে? দূর থেকে দেখলে মনে হবে, বিশাল এক প্রাগৈতিহাসিক হাতি শুঁড় নামিয়ে বিষাদগ্রস্ত হয়ে বসে আছে। গায়ের রঙ কালচে হয়ে গেছে, পিঠের ওপর জমেছে শেওলার আস্তরণ।

কাছে গেলে আপনার ভুল ভাঙবে। ওটা কোনো রক্ত-মাংসের প্রাণী নয়, ওটা ইট-পাথর আর ফেরো-সিমেন্টের তৈরি এক অবিশ্বাস্য স্থাপত্যকর্ম—যার নাম ‘হাতির বাংলো’।

১৮৯৮ সালের এক খামখেয়ালি স্থাপত্য

সময়টা ১৮৯৮ সাল। আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের সদর দপ্তর বা আজকের সিআরবি ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে ঠিক বছরখানেক আগে। রেললাইন তখন চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে ফেনীর দিকে ডানা মেলছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন সেই মিস্টার ব্রাউনজার (যিনি স্টেশন মাস্টারের গোপন সিঁড়িও বানিয়েছিলেন)।

এই ব্রাউনজার সাহেব ছিলেন একাধারে প্রকৌশলী এবং শিল্পী। ফেনী পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীদের থাকার জন্য তিনি পাহাড়ের ওপর এমন এক বাংলো বানালেন, যা দেখলে মনে হয় কোনো রূপকথার পাতা থেকে উঠে এসেছে। ডুপ্লেক্স এই ভবনটির সামনের বারান্দার ছাদটি তিনি বানিয়েছিলেন হাতির শুঁড়ের আদলে। জানালায় ব্যবহার করলেন হেক্সাগন বা ষড়ভুজাকৃতির ফ্রেম, যা অনেকটা হাতির চোখের মতো। নিচতলায় চারটি আর দোতলায় একটি—মোট পাঁচটি বেডরুমের এই বাংলোটি ছিল ব্রিটিশ প্রকৌশলীদের বিনোদন আর আয়েশের এক স্বপ্নপুরী।

নামকরণের মিথ ও বাস্তবতা

ব্রিটিশ দলিলে এর নাম ‘হাতির বাংলো’ ছিল না। তবে কেন এই নাম? জনশ্রুতি আছে, এই পাহাড়ের আশেপাশেই কোথাও ছিল ব্রিটিশদের হাতি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। আর ভবনের আকৃতিও ছিল হাতির মতো। তাই স্থানীয়রা একে ডাকতে শুরু করে ‘হাতির বাংলো’ নামে। সেই নামেই আজ শতবর্ষ পার করে দাঁড়িয়ে আছে এই স্থাপনা।

পাথরের হাতিতে যখন ঘুণপোকার হানা 

আগের পর্বে আমরা বলেছিলাম সেই ‘প্রত্নতাত্ত্বিক ফার্নিচার’ আর ‘ঘুণপোকা’র কথা। দুঃখজনক হলেও সত্য, সিআরবি’র এই নান্দনিক ফার্নিচারটিও আজ ঘুণপোকাদের পেটে যাচ্ছে। তবে এখানের ঘুণপোকাগুলো একটু ভিন্ন। এরা হলো ‘অবহেলা’ আর ‘অনাদরের’ ঘুণপোকা।

২০১৬ সাল পর্যন্তও এই ভবনে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বসবাস করতেন। কিন্তু তারপর? নতুন দালানকোঠার ভিড়ে ব্রাউনজারের এই শখের হাতিটি হয়ে পড়ল ব্রাত্য। আজ এটি পরিত্যক্ত। ২০২৩ সালে নাকি একবার সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তার কোনো ছাপ এই জরাজীর্ণ ভবনের গায়ে নেই।

যে ভবনটি হতে পারত চট্টগ্রাম রেলওয়ের গর্ব, হতে পারত পর্যটকদের জন্য এক অনন্য মিউজিয়াম—তা আজ ঝোপঝাড়ের আড়ালে ধুঁকছে। এর গা বেয়ে নামছে বৃষ্টির পানি, ফাটল ধরেছে সেই ঐতিহাসিক শুঁড়ে। সমসাময়িক স্থপতিরা বলছেন, এখনই যদি এই ‘হাতির বাংলো’র চিকিৎসা করা না হয়, তবে খুব শীঘ্রই এই হাতিটি চিরতরে লুটিয়ে পড়বে মাটিতে।

শেষের আগে 

১৮৯৮ থেকে ২০২৪—মাঝখানে কেটে গেছে ১২৬ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে কত ঝড়-ঝঞ্ঝা গেছে, কিন্তু ‘হাতির বাংলো’ ঠাঁই দাঁড়িয়ে ছিল। অথচ আমাদের উদাসীনতা আজ তাকে মৃত্যুর দুয়ারে নিয়ে গেছে। আমরা কি এতটাই নিষ্ঠুর যে, চোখের সামনে ইতিহাসের এই অনন্য সাক্ষীটিকে তিলে তিলে শেষ হয়ে যেতে দেখব?

বটতলী স্টেশনের সিঁড়ি দিয়ে যে ইতিহাসের যাত্রা শুরু হয়েছিল, এই হাতির বাংলোর সামনে এসে তা যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। হাতিটি কি তার করুণ শুঁড় তুলে আমাদের কাছে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছে? নাকি সেও জানে, এই শহরের মানুষেরা ইতিহাস বাঁচানোর চেয়ে ইতিহাস ভুলতেই বেশি ভালোবাসে?

রেলের এই বিশাল সাম্রাজ্যে আরও কত অজানা গল্প লুকিয়ে আছে কে জানে! হয়তো পরের কোনো বাঁকে অপেক্ষা করছে আরও রোমহর্ষক কোনো স্মৃতি।

(চলবে…)

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *