ঘোড়াঘাটে ১৬ বছরের আইনি লড়াইয়ে জয়, ঢোল পিটিয়ে আদিবাসী কৃষককে জমি ফেরত দিল আদালত

শাহ আলম, ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে দীর্ঘ ১৬ বছরের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আদালতের রায়ে নিজের পৈতৃক অধিকার ও জমির মালিকানা ফিরে পেয়েছেন লগেন কিস্কু নামের এক প্রান্তিক আদিবাসী কৃষক। শনিবার (২০ জুন) বিকেলে উপজেলার ৩নং সিংড়া ইউনিয়নের বিরাহিপুর গুচ্ছগ্রাম এলাকায় আদালত নিযুক্ত প্রতিনিধিদল উপস্থিত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জমি পরিমাপ ও লাল নিশানা গেঁড়ে প্রকৃত মালিককে দখল বুঝিয়ে দেন। এ সময় গ্রামীণ ঐতিহ্য অনুযায়ী ঢোল পিটিয়ে জমির মালিকানা হস্তান্তর করা হয়।

২০১০ থেকে ২০২৬: ১৬ বছরের আইনি পরিক্রমা

আদালত নিযুক্ত কমিশনার অ্যাডভোকেট আনারুল হক মানিক এবং স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালে স্থানীয় নারায়ণ চন্দ্র মহন্ত গংদের সঙ্গে ৩৬ শতক জমি নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন লগেন কিস্কু। জমিটি নিজের নামে বৈধভাবে ক্রয় করলেও প্রতিপক্ষের প্রভাবশালী মহলের অবৈধ দখলের কারণে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি তা ভোগদখল করতে পারছিলেন না। স্থানীয়ভাবে একাধিক সালিস বৈঠক করেও কোনো সমাধান না হওয়ায় অবশেষে ন্যায়বিচারের আশায় দিনাজপুর সহকারী জজ আদালতে মামলা দায়ের করেন লগেন।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া ও সাক্ষ্যপ্রমাণ শেষে ২০২২ সালে আদালত লগেন কিস্কুকে জমির বৈধ মালিক ঘোষণা করে রায় দেন। এরপর প্রতিপক্ষ এই রায়ের বিরুদ্ধে জেলা জজ আদালতে আপিল করলেও ২০২৫ সালে সেই আপিলও খারিজ হয়ে যায়। সর্বশেষ চলতি ২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল আদালত চূড়ান্ত আদেশে জমির প্রকৃত দখল লগেন কিস্কুর কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।

লাল নিশানা ও ঢোল পিটিয়ে দখল হস্তান্তর

আদালতের চূড়ান্ত আদেশ বাস্তবায়নে শনিবার বিকেলে দিনাজপুর সহকারী জজ আদালতের জারি কারক কাওসার আলমের উপস্থিতিতে এবং আদালতের নিযুক্ত সার্ভেয়ার দিয়ে বিরোধপূর্ণ ৩৬ শতক জমি নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা হয়। সীমানা নির্ধারণ নিশ্চিত করতে জমির চার কোণায় লাল নিশানা গেঁড়ে চিহ্নিত করা হয়। এরপর স্থানীয় শত শত মানুষের উপস্থিতিতে ঢোল পিটিয়ে অত্যন্ত আনন্দঘন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে লগেন কিস্কুকে জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আইনি অধিকার ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত কৃষক লগেন কিস্কু বলেন,

“আমি আইনের প্রতি শতভাগ আস্থা রেখে প্রতিকার চেয়েছিলাম। ১৬ বছর লেগেছে, অনেক কষ্ট করেছি, কিন্তু আজ আমি আমার নিজের জমি ফিরে পেয়েছি। আদালতের প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ।”

দিনাজপুর সহকারী জজ আদালতের জারি কারক কাওসার আলম জানান, আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও আইনি প্রক্রিয়া মেনে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও সুشৃঙ্খলভাবে জমির প্রকৃত মালিককে তাঁর আইনি অধিকার বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের এই বিরোধের সুষ্ঠু নিষ্পত্তিতে স্থানীয় এলাকাবাসীও স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *