৩২ বছর ধরে পঙ্গু স্বামীর সেবা: ভালোবাসার অনন্য এক ‘জয়নব বিবি’

মোস্তাফিজার রহমান জাহাঙ্গীর, কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি

ভালোবাসা যে কেবল রঙিন কথায় নয়, বরং ত্যাগের মহিমায় ফুটে ওঠে—তার জীবন্ত উদাহরণ কুড়িগ্রামের জয়নব বিবি। দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে পঙ্গু ও দৃষ্টিহীন স্বামীর সেবা করে দাম্পত্য প্রেমের এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এই নারী।

বিয়ের ১৫ বছর পরই দুর্যোগ

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার কুটিচন্দ্রখানা গ্রামের জমির উদ্দিন ও জয়নব বিবি দম্পতির সংসার ভালোই চলছিল। কিন্তু বিয়ের ১৫ বছর পরেই হঠাৎ এক গুরুতর অসুস্থতায় পঙ্গুত্ব বরণ করেন জমির উদ্দিন। হারিয়ে ফেলেন চোখের দৃষ্টিও। সেই থেকে শুরু হয় জয়নব বিবির জীবনযুদ্ধ।

দিন শুরু হয় সেবার মধ্য দিয়ে

গত তিন দশক ধরে জয়নব বিবির প্রতিটি দিন শুরু হয় পঙ্গু স্বামীকে গোসল করানো ও নিজ হাতে খাইয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে। স্বামীর দৈনন্দিন প্রতিটি প্রয়োজন তিনি নিজ হাতে পূরণ করেন। চরম আর্থিক অনটন আর শারীরিক কষ্ট থাকলেও জয়নব বিবি কখনো স্বামীকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবেননি। অর্থনৈতিক সংকট কিংবা সামাজিক চাপ—কোনো কিছুই তাকে স্বামীর সেবা থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।

‘স্বামীর সেবায় জান্নাত’

নিজের ত্যাগের বিষয়ে জয়নব বিবি বলেন, “ইসলাম ধর্মে স্বামীর সেবা করার তাগিদ রয়েছে। আমি কোনো প্রতিদানের আশায় নয়, বরং ভালোবেসে আমার স্বামীর সেবা করে যাচ্ছি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই সেবা আমি অব্যাহত রাখতে চাই।”

অন্যদিকে আবেগাপ্লুত স্বামী জমির উদ্দিন বলেন, “আমি পঙ্গু ও অন্ধ হলেও আমার স্ত্রী আমাকে ছেড়ে যাননি। ৩২ বছর ধরে তিনি আমার সেবা করছেন। আমি তাকে পেয়ে ধন্য এবং তার জন্য সবসময় দোয়া করি।”

এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্তমান সমাজে যখন ঠুনকো কারণে সংসার ভেঙে যায়, সেখানে জয়নব বিবির এমন আত্মত্যাগ সত্যিই বিরল। তিনি এলাকার মানুষের কাছে এখন এক আদর্শ সেবিকা ও মানবিকতার অনুপ্রেরণা। দাম্পত্য ভালোবাসা ও মানবিক মূল্যবোধের এই গল্পটি এখন পুরো কুড়িগ্রাম জেলাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *