গোপনে ওপেন করা ছোট পর্দায় বড়দের নাটক দেখানোর মহান অধিপতি “জনাব জোকারবার্গ”
শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

হে জোকারবার্গ, আপনাকে অভিনন্দন! আপনি এমন এক পৃথিবী নির্মাণ করেছেন, যেখানে একজন মানুষের মৃত্যুযন্ত্রণা, দুর্ঘটনা, যৌন নিপীড়ন, রক্তাক্ত শরীর কিংবা অসহায় কান্না দেখার পর আজ মানুষ সহযোগিতার হাত না বাড়িয়ে পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে ভিডিও করা বা ছবি তোলার প্রতিযোগিতায় নামে। আপনার অ্যালগরিদম মুখিয়ে থাকে সেই বীভৎস মুহূর্তগুলোকে লাল গালিচা বিছিয়ে সংবর্ধনা জানিয়ে সারা বিশ্বের কোটি কোটি চোখের সামনে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। আপনার এই ডিজিটাল সাম্রাজ্যে এখন আর সাহায্যের হাত প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন কেবল ভাইরাল হওয়ার নেশায় মত্ত একদল দর্শক।
মানবিকতাকে পদদলিত করে বীভৎসতাকে এভাবে রাজকীয় সংবর্ধনা দেওয়ার মহিমা কেবল আপনার ওই ‘জোকারবাদি’ দর্শনেই সম্ভব, মহান সম্পাদক!
আদিম কৌতূহল ও আধুনিক ব্যবসা
একসময় মানুষ লুকিয়ে বড়দের সিনেমা দেখত। আজ আপনার অ্যালগরিদম সেই একই আদিম কৌতূহলকে আরও আধুনিক, আরও লাভজনক এবং আরও পরিশীলিত ব্যবসায় রূপ দিয়েছে। এখন আর অভিনয়ের দরকার হয় না; বাস্তব মানুষের বাস্তব যন্ত্রণা, রক্ত আর অসহায়ত্বই আপনার ব্যবসার সবচাইতে শক্তিশালী জ্বালানি। যৌন নিপীড়ন থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত—সবই আপনার প্ল্যাটফর্মে তৃপ্তি নিয়ে দেখা এক একটি নাটক। একসময় দেখতাম শিক্ষণীয় সিনেমা দেখতে মানুষ খুব কম যেত, কিন্তু পাশাপাশি এক টিকেটে দুই ছবি দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়ত। কারণ, ইংরেজি সিনেমার মাঝখানে সেই বড় পর্দায় দেখানো হতো ‘বড়দের নাটক’। আজকে আপনি সেই ‘বড়দের নাটক’ দেখার ব্যবস্থা ছোট পর্দায় প্রত্যেকের হাতের মুঠোয় করে দিয়েছেন।
মানুষের জীবনের চরমতম ট্র্যাজেডিকে ‘গোপনে ওপেন করা বড়দের নাটকে’ রূপান্তরের এই অসামান্য কারিগরি দক্ষতা দেখে আমরা সত্যিই অভিভূত!
ক্ষমতার অপব্যবহার ও মানবতার সংজ্ঞা বদল
সৃষ্টিকর্তা আপনাকে যে ক্ষমতা দিয়েছিলেন, তা খুব কম মানুষই পায়। পৃথিবীর মানুষকে একে অপরের কাছে নিয়ে আসার, জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার, মানবিকতাকে শক্তিশালী করার এবং ভালো কাজকে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার মতো বিশাল এক দায়িত্ব আপনার হাতে ছিল। কিন্তু আপনি বেছে নিয়েছেন অন্য পথটি—মানুষের সবচেয়ে দুর্বল ও অসহায় মুহূর্তকে সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যবসায়িক সম্পদে পরিণত করার পথ। আপনি কেবল পথই বদলাননি, আপনি মানবতার সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছেন।
পবিত্র আমানতকে সস্তা বিনোদনের পণ্যে রূপান্তরের এই জাদুকরী প্রতিভা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নজির হয়ে থাকবে!

অ্যালগরিদমের আসল মানদণ্ড
আমি প্রায়ই ভাবি, আপনার অ্যালগরিদম আসলে ঠিক কী খুঁজে বেড়ায়? একজন শিক্ষক যখন বিনা টাকায় গ্রামের শিশুদের পড়াচ্ছেন, কিংবা কোনো বিজ্ঞানী যখন নতুন কিছু আবিষ্কার করছেন—সেগুলো কি আপনার অ্যালগরিদমের নজরে পড়ে? নাকি রাস্তার পাশে পড়ে থাকা রক্তাক্ত কোনো মানুষ বা নিপীড়িত নারীর আর্তনাদই আপনার প্ল্যাটফর্মের সাফল্যের আসল মানদণ্ড? উত্তরটা আমরা প্রতিদিন আমাদের নিউজফিডেই দেখতে পাই।
একজন বিজ্ঞানীর গবেষণার চেয়ে একজন ভুক্তভোগীর যন্ত্রণাকাতর ভিডিও যে বেশি ‘প্রফিটেবল’, সেই অমোঘ সত্যটি শিখিয়ে দেওয়ার জন্য আপনাকে শত ধন্য!
ভায়ার্ত ধনকুবেরের ব্যবসায়িক যুক্তি
আপনি হয়তো বলবেন, “মানুষ যা দেখতে চায়, আমরা তাই দেখাই।” ব্যবসার দৃষ্টিতে আপনার এই যুক্তি সঠিক হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসে তো আরও অনেক ব্যবসাই ছিল, যেগুলোর চাহিদা আকাশছোঁয়া—যেমন মাদকের বাজার, মানবপাচার কিংবা জুয়া। চাহিদা থাকলেই কোনো কিছু মহৎ হয়ে যায় না। আপনার এই গোপন নাটকের মাধ্যমে আপনি যে অর্থ উপার্জন করছেন, তা কি আপনার দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠ নাকি নিকৃষ্ট? যখনই আপনি জনসম্মুখে আসেন, ক্যামেরার সামনে আপনার সেই অভয়ব, আপনার সেই ভয়ার্ত চেহারা—যা অন্য কোনো বিলিওনিয়ারের চোখে আমরা দেখি না—তা আপনার ভয়েরই স্পষ্ট প্রকাশ। আপনি যে ভয় পাচ্ছেন, তা আপনার চেহারায় সর্বদাই স্পষ্ট।
নৈতিকতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে এই ‘ভয়ার্ত ধনকুবের’ হওয়ার সাহসী ব্যবসায়িক মডেলটি যেন আধুনিক যুগের শ্রেষ্ঠ আলোকবর্তিকা!
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ‘সম্পাদক’ পদকের দাবিদার
আপনার প্ল্যাটফর্ম আজ পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পাদকদের একজন। কারণ, আপনিই ঠিক করেন আজ কোটি কোটি মানুষ কী দেখবে, কী নিয়ে আতঙ্কিত হবে, আর কী একেবারেই দেখবে না। সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে আপনি যদি মানুষের সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্তগুলোকে সবচেয়ে লাভজনক কনটেন্টে পরিণত করেন, তবে প্রশ্নটা আর সম্পদের থাকে না, প্রশ্নটা হয়ে দাঁড়ায় আপনার অগ্রাধিকারের—যা আপনার চেহারার অস্থিরতাতেই ফুটে ওঠে।

বিবেককে সেন্সর করার অসামান্য দক্ষতার জন্য আপনার এই ‘জোকারবাদি’ অ্যালগরিদম সত্যিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ‘সম্পাদক’ পদকের দাবিদার!
’জোকারবাদি’ পাঠশালা ও আগামী প্রজন্ম
আমি বাংলাদেশের একজন মানুষ। আমার সমাজের শিশুরাও এখন এই একই অ্যালগরিদমের সামনে বড় হচ্ছে। তারা ধীরে ধীরে শিখছে—মানুষের কষ্টও বিনোদন হতে পারে, কারো দুর্ঘটনা মানেই ক্যামেরা বের করতে হয়, কারো মৃত্যু মানেই শেয়ার দিতে হয়। এ শিক্ষা আমরা কোনো পাঠ্যবইয়ে লিখিনি, এ শিক্ষা আমাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে ছোট্ট একটি পর্দার মাধ্যমে—আপনার সৌজন্যে। আপনি আমাদের নতুন করে বুঝিয়েছেন, প্রযুক্তি নিজে কখনো সভ্যতা তৈরি করে না, প্রযুক্তি কেবল আপনার মতো মানুষের মূল্যবোধকে আয়নায় তুলে ধরে।
আপনার এই ‘জোকারবাদি’ পাঠশালায় বেড়ে ওঠা প্রজন্ম যে আগামী দিনে কতটা অমানবিক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবে, তা কল্পনা করতেই শিহরণ জাগে!
বিবেকের কাঠগড়ায় একটি চূড়ান্ত প্রশ্ন
শেষে একটি প্রশ্ন রেখে যাচ্ছি—আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে যদি একদিন এমন একটি মোবাইল থাকে, যেখানে অ্যালগরিদম প্রথমেই তাদের সামনে তুলে ধরে যৌনতা, রক্ত, মৃত্যু, আতঙ্ক আর মানুষের অসহায়ত্ব, তখন কি আপনি একইভাবে বলবেন, “মানুষ তো এটাই দেখতে চায়”? যদি উত্তর “হ্যাঁ” হয়, তাহলে আপনাকে আর কিছু বলার নেই। আর যদি উত্তর “না” হয়, তবে পৃথিবীর জন্য এখনও আশা আছে। কারণ, সমস্যাটা প্রযুক্তিতে নয়; সমস্যাটা সেই মানুষটির বিবেকে, যিনি প্রযুক্তিকে এমন এক অসুস্থ সিদ্ধান্ত নিতে শিখিয়েছেন।
আপনার নিজের নাতি-নাতনিদের হাতে এই ভয়াবহ ‘জোকারবাদি’ উপহার তুলে দেওয়ার মহৎ পরিকল্পনাটিই হয়তো আপনার সাফল্যের চূড়ান্ত সার্থকতা এনে দিবে!
কিন্তু কোনো একদিন যদি আপনার পূর্বসূরি জনাব ইবলিশ, অসুস্থতার অযুহাতে সাপ্তাহিক ছুটি নেন, সেদিন তো আপনার আয় শূন্যে নেমে যাবে! ভেবেছেন কোনো দিন?
