মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগে ফোনে স্ত্রীকে যা বলেছিলেন ক্যাপ্টেন তানভীর

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

পিলখানায় সংঘটিত বর্বর হত্যাকাণ্ড তদন্তের জন্য গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে ভয়ানক সব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিডিআর হত্যাকাণ্ডে বহিঃশক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সরাসরি জড়িত থাকার শক্তিশালী প্রমাণ মিলেছে। এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসার পাশাপাশি, নিহত ক্যাপ্টেন তানভীর হায়দার নূরের স্ত্রীর ভাষ্যে তাঁর শেষ ফোনালাপের বিবরণও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে, যেখানে তিনি ভারতীয় একটি সংস্থার নাম উল্লেখ করেছিলেন।

মৃত্যুর পূর্বে ক্যাপ্টেনের শেষ কথা

ক্যাপ্টেন তানভীর হায়দার নূরের স্ত্রী তাসনুভা মাহা ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর ক্যাপ্টেন তানভীরের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলার সময় ক্যাপ্টেন তানভীর তাকে পিলখানার ভেতরে ভারতীয় সংস্থা National Security Guard (NSG) of India-এর নাম বলেন।

বেগম তাসনুভার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর শেষ ফোনালাপের সময় ক্যাপ্টেন তানভীর তাঁকে বলেন, “লীগের নেতারা অন্য পোশাকে এসেছেন।” তিনি আরও বলেন, “ওর মুখে আমি এনএসজি নিয়ে কিছু কথা শুনেছি… আমি দুবার তাকে জিজ্ঞেস করেছি, এনএসজি কী? তখন একপর্যায়ে তিনি বেশ বিরক্ত হয়ে বলেন, Indians! Indians।”

এছাড়া বেগম তাসনুভা মাহা বলেন, তিনি চুল বড় তিনজনকে বিডিআরের টি-শার্ট ও স্যান্ডেল পরা অবস্থায় দেখেছেন, যারা তাকে হিন্দিতে গালাগাল করেছে এবং তার সন্তানদের ‘পাকিস্তানি লাডলা’ বলেছে। (সূত্র: শহীদ পরিবার সাক্ষী নম্বর: ১২)।

পরিকল্পনা ও সমন্বয়কের ভূমিকা

২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওই ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। ঘটনার দেড় দশক এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর সাত সদস্যের জাতীয় স্বাধীন কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশনের প্রধান হলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান। কমিশন প্রায় ১১ মাস তদন্ত শেষে গত রোববার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে ৩৬০ পৃষ্ঠার মূল প্রতিবেদন হস্তান্তর করে।

কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিডিআর হত্যাকাণ্ড ছিল পরিকল্পিত

  • প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৎকালীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছিলেন।
  • তাপসের বাসায় আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিমের উপস্থিতিতে বিডিআর সদস্যদের একাধিক বৈঠক হয়। একটি বৈঠকে অফিসারদের জিম্মি করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়, পরে তা পরিবর্তন করে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
  • প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই শেখ সেলিমের উপস্থিতিতে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার ২৪ জনের একটি দল বৈঠকে অংশ নেয়। সেখানে সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং তাপসকে হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টদের নিরাপদে পালিয়ে যেতে সহায়তার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
  • পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একাধিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক, মির্জা আজম, লেদার লিটন ও তোরাব আলী
  • এসব পরিকল্পনা সম্পর্কে ৪৪ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের সিও কর্নেল শামস অবগত ছিলেন এবং তাপস তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে সিদ্ধান্তের অনুমোদন নেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *