‘১৫ বছর বিএনপির নেতৃত্বের ব্যর্থতার ফলেই এদেশে যুবকেরা প্রাণ দিয়েছে’ — আল্লামা মামুনুল হক

রাশিদ আহমেদ নিসর্গ, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি

“বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের জন্যে যেকোনো কঠিন থেকে কঠিনতর পথ অবলম্বন করতে আমরা কুণ্ঠিত হবো না।” — শনিবার (২৭ জুন) বিকেলে নগরীর রেলওয়ে কৃষ্ণচূড়া চত্বরে ১১ দলীয় ঐক্যের ময়মনসিংহ বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর আল্লামা মামুনুল হক।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ময়মনসিংহ অঞ্চল পরিচালক অধ্যক্ষ মো. শাহাবুদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বিশাল সমাবেশে বিগত সরকারের ফ্যাসিবাদী শাসন, বিএনপির রাজনৈতিক ব্যর্থতা এবং সাম্প্রতিক নির্বাচন নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন জোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।

ফ্যাসিবাদী শাসন ও বিএনপির রাজনৈতিক ব্যর্থতা

প্রধান অতিথির বক্তব্যে আল্লামা মামুনুল হক বিগত স্বৈরাচারী সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা ক্ষমতার মসনদকে কুক্ষিগত করে বাংলাদেশের মানুষের ওপর জুলুম, নির্যাতন এবং বৈষম্যের স্টিমরোলার চালিয়েছিল। গুম, খুন ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে গোটা দেশের মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস তুলে ফেলেছিল। ২০১৪ সালের বিনা ভোটের সরকার, ২০১৮ সালের রাতের ভোট এবং ২০২৪ সালের ‘ডামি’ নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছিল।

এ সময় তিনি বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করে বলেন—

“ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিএনপি কেবল ঈদের চাঁদ ওঠার অপেক্ষায় ছিল—কবে চাঁদ উঠবে, ঈদ আসবে, এরপর আন্দোলন হবে! পনেরো বছর ধরে বিএনপির নেতৃত্বের এই ব্যর্থতার ফল হিসেবে এদেশে যুবকেরা প্রাণ দিয়েছে। ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে, আল্লামা সাঈদীকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসির রায় দেওয়ায় এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে এদেশের মানুষেরা জীবন ও রক্ত দিয়েছে। রক্তের সাগর পেরিয়ে বাংলার মানুষ নতুন করে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে এনেছে।”

‘জুলাই সনদ’ নিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্র সংস্কার প্রসঙ্গে আল্লামা মামুনুল হক বলেন, বাংলাদেশের মানুষ দ্বিতীয় গণতন্ত্র গঠনের জন্য আন্দোলন করেছিল। তাদের দাবি ছিল ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য বিলোপ এবং ফ্যাসিবাদের চিরতরে বিদায়।

তিনি অভিযোগ করেন, ফ্যাসিবাদের দুয়ার চিরতরে বন্ধ করতে ৩৩টি রাজনৈতিক দল মিলে ৯ মাস ধরে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার একটি প্রস্তাবনা তৈরি করেছিল, যা ‘জুলাই সনদ’ নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতায় ভারসাম্য এনে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতির হাতে কিছু ক্ষমতা ন্যস্ত করার এবং প্রশাসনকে দলীয়করণমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু এই ঐকমত্য নস্যাৎ করার অভিযোগ তুলে তিনি বিএনপিকে হুঁশিয়ার করে বলেন—

“যখন সেই জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হবে এবং সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশের দিকে মানুষ যাত্রা করবে, ঠিক সেই সময় বিএনপির কিছু লোক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে ঘাপটি মেরে থাকা চাটুকারদের সঙ্গে রাতের অন্ধকারে চুক্তি করে জুলাই সনদকে কলঙ্কিত করেছে। ৩২টি রাজনৈতিক দলকে অন্ধকারে রেখে আপনারা যে চোরাই পথ আবিষ্কার করেছেন, কল্যাণকামী হিসেবে বলতে চাই—এই চোরাই পথ দিয়ে যদি আপনারা সংস্কারের অভিপ্রায়কে পায়ে দলার চেষ্টা করেন, তবে তা আপনাদের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে।”

নির্বাচন কারচুপির অভিযোগ: মিয়া গোলাম পরওয়ার

সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সাম্প্রতিক নির্বাচনে কারচুপির গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তিনি গণভোটের রায় কার্যকর করা এবং নিত্যদিনের জনদুর্ভোগ দূর করার জোর দাবি জানান।

বর্তমান ক্ষমতাসীনদের (বিএনপি) প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “এখন ক্ষমতায় যারা আছেন, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদ চালাতে চান। বিরোধী দলে কারা আছেন, তা তারা দেখার প্রয়োজন মনে করছেন না।”

তিনি আরও বিস্ফোরক অভিযোগ করে বলেন—

“আপনারা নির্বাচিত হয়ে যেভাবেই হোক এসে গেছেন। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করেছেন, ফলাফল ম্যানিপুলেশন করেছেন। বিএনপির অভ্যন্তরে লুকানো কিছু গুপ্ত উপদেষ্টা ছিল, যারা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে বিরোধী দলের অনেক নেতাকে ইচ্ছে করে হারিয়ে দিয়েছে। তা না হলে আমরা ১১ দল অন্তত ১৮০টির মতো আসন পেতে যাচ্ছিলাম। ফলাফল ঘোষণার এক পর্যায়ে হঠাৎ সব মিডিয়াতে ফলাফল প্রচার বন্ধ করে এই কারচুপি করা হয়।”

১১ দলীয় জোটের এই বিভাগীয় সমাবেশে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশকে কেন্দ্র করে নগরীতে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার পাশাপাশি কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *