সুলতান আহমদ, জামালপুর প্রতিনিধি

সহপাঠীদের সঙ্গে মারামারির অভিযোগে হবিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী “বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল”-এর প্রথম শ্রেণির এক শিশু শিক্ষার্থীকে টানা ৭ দিন স্কুলে না আসার নির্দেশ দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রিন্সিপাল। মাত্র ৬-৭ বছর বয়সী একজন কোমলমতি শিক্ষার্থীকে দীর্ঘদিন শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত রাখার এ সিদ্ধান্তে অভিভাবক মহল ও স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ওই শিশু শিক্ষার্থীর স্কুলে না যাওয়ার নিষেধাজ্ঞার তৃতীয় দিন চলছে। প্রতিদিনের মতো ভোরে ঘুম থেকে উঠলেও স্কুলে যাওয়ার বদলে নিজ ঘরে মাটির হাঁড়িপাতিল নিয়ে খেলাধুলা করে সময় কাটাতে হচ্ছে শিশুটিকে।
মেধাবী শিক্ষার্থীর ওপর শাস্তির খড়্গ
ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শাহাদুল ইসলাম জানান, তাঁর সন্তান পড়ালেখায় অত্যন্ত নম্বরধারী ও মেধাবী। সে অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছে এবং ক্লাস টেস্টগুলোতে নিয়মিত ১০ এ ১০ পায়।
তিনি অভিযোগ করে বলেন—
”আমি সরকারি চাকরি করি, ডিলার ও কৃষকদের সামলাতে হয়। বাচ্চার মা-ই তাকে বেশি সময় দেয়। স্কুলে মাত্র ৩ ঘণ্টার জন্য গেলেও আমার বাচ্চা মাঝেমধ্যেই সহপাঠীদের দ্বারা মারধরের শিকার হতো। একদিন এক সহপাঠী তার মাথায় আঘাত করে রক্ত পর্যন্ত বের করে ফেলেছিল, আরেকদিন চারজন মিলে তাকে মারে। আমি তাকে শিখিয়েছিলাম কেউ মারলে শিক্ষকের কাছে বিচার দিতে, নিজে হাত না তুলতে। কিন্তু ক্লাস শিক্ষকরা কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেননি।”
টিসি দেওয়ার ভয় ও প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা
কৃষিবিদ শাহাদুল ইসলাম আরও জানান, গত বৃহস্পতিবার শ্রেণিশিক্ষক অভিযোগ তোলেন যে তাঁর সন্তান অন্যদের মেরেছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে প্রিন্সিপাল শিশুটির মাকে স্কুলে ডেকে এনে সরাসরি ৭ দিন স্কুলে না পাঠানোর মৌখিক নির্দেশ দেন। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির এক শিক্ষক প্রায়ই ওই শিশুকে টিসি (ট্রান্সফার সার্টিফিকেট) দেওয়ার ভয় দেখান, যা ৬-৭ বছরের একটি অবোধ শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
অভিভাবকের প্রশ্ন—
”ছোট বাচ্চারা স্কুলে একটু-আধটু দুষ্টুমি বা মারামারি করতেই পারে। তাদের সামলে রাখা ও ভুল শুধরে দেওয়া শিক্ষক এবং কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে একটি শিশুকে ৭ দিন শিক্ষা জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা কতটা যুক্তিযুক্ত? এই শিশুটির শিক্ষাজীবনের ৭টি দিন নষ্ট করার অধিকার কি প্রিন্সিপাল রাখেন?”
শিক্ষা নীতিমালা ও শিশু মনোবিজ্ঞানীদের মতামত
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহল ও শিক্ষাবিদদের মাঝে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তাদের মতে, প্রাথমিক স্তরের শিশুদের ক্ষেত্রে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় উভয় পক্ষের অভিভাবকদের ডেকে পেশাদার কাউন্সেলিং করা এবং শিশু মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের স্পষ্ট নীতিমালায় প্রাথমিক স্তরের শিশুদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং দীর্ঘ মেয়াদে বিদ্যালয় থেকে বিরত রাখা কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত ও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেখানে এমন কঠোর পদক্ষেপ শিক্ষার পরিবেশকে ব্যাহত করে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য মেলেনি
প্রথম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থীকে ৭ দিনের জন্য স্কুলে আসা নিষিদ্ধ করার বিষয়ে এবং প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তির প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুলের প্রিন্সিপালের সাথে যোগাযোগের একাধিক চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
