বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রে লুটপাটের মহোৎসব: ইলন ও জিএম ঈমাম সিন্ডিকেটে ৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
অনিয়ম-দুর্নীতি এবং জালিয়াতির মাধ্যমে শিল্পীদের ৪ কোটি টাকা আত্মসাৎসহ কয়েকটি গুরুতর অপরাধ তদন্ত কমিটি কর্তৃক প্রমাণের পরও ছাত্রলীগের সাবেক গবেষণা সম্পাদক, আওয়ামী সরকারের বিশেষ সুবিধাভোগী, বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রের নির্বাহী প্রযোজক মো: সফির হোসাইন ওরফে ইলন সফির এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। ফলে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্র এখন লুটপাটের মহোৎসবে পরিণত হয়েছে।
কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) মো: ঈমাম হোসাইন এবং নির্বাহী প্রযোজক মো: সফির হোসাইনের নেতৃত্বে ‘হোসাইন সিন্ডিকেট’-এর সদস্যরা জুলাই অভ্যুত্থান অনুষ্ঠানের নামে ভূয়া বাজেট ও বিল ভাউচারের মাধ্যমে চরমভাবে লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি ঈমাম হোসাইনের যোগসাজসে সফির হোসাইন নির্বাহী প্রযোজক হওয়া সত্ত্বেও সরকারের আইন লঙ্ঘন করে জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া প্রোগ্রাম ম্যানেজার সেজে লক্ষ-লক্ষ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করছেন। দেখার কেউ নেই; যেন মগের মুল্লুক।
ইলন সফিরের দুর্নীতি ও সম্পদ
বিটিভির প্রধান কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ইলন সফিরের বিরুদ্ধে জালিয়াতি, ছলচাতুরি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে শিল্পীদের কোটি-কোটি টাকা আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় গত ০২ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিটিভির মহাপরিচালককে নির্দেশ প্রদান করেন।
তদন্তে প্রমাণ: মহাপরিচালক তদন্ত কমিটি (আহ্বায়ক: পরিচালক অনুষ্ঠান ও পরিকল্পনা মো: আজগর আলী) গঠন করেন। কমিটি দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ২৬ আগস্ট ২০২৫ তারিখে মহাপরিচালক বরাবর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। কমিটি সূত্রে জানা যায়, মো: সফির হোসাইন শুধুমাত্র বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রে তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) মাহফুজা আক্তারের সঙ্গে আঁতাত করে ভূয়া বাজেট ও বিল ভাউচারের মাধ্যমে =১,২৩,১২,৭২২/- (১ কোটি ২৩ লক্ষ ১২ হাজার ৭ শত ২২ টাকা) টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন যা তদন্ত কমিটির কাছে প্রমাণ মিলেছে।
অন্যান্য অপরাধ: মো: সফির হোসাইন ইতঃপূর্বেও বহুভাবে দুর্নীতি করেছেন বলে জানা যায়। এত অপরাধ প্রমাণের পরও তদন্ত প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে না পাঠানোর জন্য গ্রামের বাড়ি গাজীপুর এলাকাবাসী হিসেবে একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে ফাইলটি গায়েব করা হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে প্রধান কার্যালয়ে তোড়পাড় শুরু হয় ফলে মহাপরিচালক তদন্ত প্রতিবেদন সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছেন।
সম্পদের উৎস: আত্মসাৎকৃত এই অর্থ দিয়ে মো: সফির হোসাইন চাকরির ৩ বছরের মাথায় গাজীপুরে শশুরবাড়ির পার্শ্বে ৬ একর মূল্যবান জমি, দামি গাড়ি এবং হাতির ঝিলের মতো মূল্যবান জায়গায় ২৬০০ স্কয়ার ফিটের অত্যাধুনিক ফ্ল্যাট ক্রয় করেন।
পূর্বের সুবিধা: একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মো: সফির হোসাইন ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে বিগত সরকারের আমলে অনেক সুবিধা গ্রহণ করেছেন। সুবিধার অংশ হিসেবে সফির হোসাইন ছাত্রলীগের প্রভাব খাটিয়ে ১৭/১১/২০২০ তারিখে বিশেষ সুবিধা গ্রহণ করেন।
জিএম ঈমাম হোসাইনের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার
মো: ঈমাম হোসাইন সব ক্ষেত্রে সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক-সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আব্দুল মতিনসহ বেশ কয়েকজন আওয়ামী প্রভাবশালী নেতা ও আমলাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে দাম্বিকতার সহিত চাকুরি করে আসছিলেন। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানের পর হটাৎ ভোল পাল্টে ফেনী-নোয়াখালী ইজমের ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে আইন-বিধি-বিধান লঙ্ঘন করে কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে এবং কর্তৃপক্ষকে জিম্মি করে চট্টগ্রাম কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব দিতে বাধ্য করেন।
অবৈধভাবে দায়িত্বে: সরকারি চাকুরির বিধি-বিধান অনুসারে একজন কর্মকর্তা ৬ মাসের বেশি চলতি দায়িত্বে থাকতে পারেন না এবং দায়িত্বভাতাও নিতে পারেন না কিন্তু মো: ঈমাম হোসাইন ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে একদিকে তিনি সরকারের আইন লঙ্ঘন করে জেনারেল ম্যানেজারের পদ দখল করে আছেন অন্যদিকে অবৈধভাবে মাসে মাসে দায়িত্বভাতাসহ বেতন নিয়ে যাচ্ছেন (প্রমাণক সংযুক্ত, পৃষ্ঠা: ২৪-৩৪)।
অন্য কেন্দ্রে দুর্নীতি: মো: ঈমাম হোসাইন ঢাকা কেন্দ্রে অনুষ্ঠানের নির্মাণের নামে ভুয়া শিল্পীদের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা উত্তোলন করে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। বিশেষ করে ঢাকা কেন্দ্রে থাকাকালে ৪১টি মঞ্চ নাটক পুনঃপ্রচার দিয়েও ৪৭,৯৭,০০০/- টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রে: চট্টগ্রাম কেন্দ্রে প্রোগ্রাম ম্যানেজার থাকাকালেও “ইতিহাসের এই দিনে” শিরোনামে ২ মিনিটের একটি ধারাবাহিক গ্রাফিক্স কার্ড বারবার প্রচার করে ২৯ বার লক্ষাধিক টাকার বাজেট করে ৩৩ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। বিভিন্ন জেলায় ভুয়া ভ্রমণ দেখিয়ে ৪ মাসে ৭,২৩,০০০/ টাকা উত্তোলন করেছেন যা কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বিরল।
অন্যান্য আত্মসাৎ: মো: সফির হোসাইন রোমানা শারমিনকে ছুটি দেখিয়ে কেন্দ্রের তৎকালীন জিএম মাহফুজা আক্তারের সঙ্গে আতাত করে ভুয়া বিল ভাউচার ও বাজেটের মাধ্যমে ৪ মাসে শিল্পী সম্মানীর =৬০,৫৮,৩৪৬/- (ষাট লক্ষ আটান্ন হাজার তিনশত সেচল্লিশ) টাকার উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন।
চলমান দুদক তদন্ত
সাবেক জেনারেল ম্যানেজার মোছা: মাহফুজা আক্তারের ২১ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে মো: সফির হোসাইনকে গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে দুদক থেকে তলব করা হয়েছিল (প্রমাণক সংযুক্ত, পৃষ্ঠা: ৩৯-৪২)।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, সফির হোসাইন এবং মাহফুজা আক্তারের তদন্ত প্রায় শেষ দিকে। আশা করা হচ্ছে খুব শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।
