“হানি ট্র্যাপের মাস্টারমাইন্ড উৎপল: লাল গোলাপের আড়ালে কোটি টাকার মরণফাঁদ”
শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

“তোমাদের মতো এমন চমৎকার জুটি তো আর দেখাই যায় না! যেন স্বর্গের জোড়!” এই কথাগুলো নিছক কোনো সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রশংসা নয়, বরং এটি একটি ভয়ংকর সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সুনিপুণ ক্যানভাসিং বা ‘মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি’! এভাবেই চারপাশ থেকে চটকদার কথার জাল বুনে তারা তাদের শিকারকে মানসিকভাবে অবশ করে দেয়। বিত্তবান কিন্তু মানসিকভাবে কিছুটা একাকী বা অসহায় নারীদের টার্গেট করে এই সিন্ডিকেট প্রথমে প্রেমের এক নিখুঁত নাটক সাজায়। এরপর সেই মিথ্যা আবেগকে পুঁজি করে তারা সুকৌশলে বৈবাহিক কাগজপত্রের মাধ্যমে এক ধরনের আইনি অধিকার তৈরি করে নেয়, যাতে লুটপাটের পথটি মসৃণ হয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এই চক্রের পারিবারিক সংশ্লিষ্টতা। প্রতারণার শিকার হয়ে ওই নারী যখন সবকিছু হারিয়ে এই প্রতারকদের মা, ভাই, বোন বা স্ত্রীর কাছে কথা বলতে যান, তখন তারা কেউ কিছুই শোনে না। শুধু টাকা-পয়সা নেওয়া শেষ হলেই তারা অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেদের মতো করে কেটে পড়ে। তাদের নির্লিপ্ত আচরণ দেখলে স্পষ্টতই বোঝা যায়, পরিবারের এই সদস্যগুলোও যেন নিজেদের জায়গা থেকে তাদের মতো করে একেকজন ‘ক্লায়েন্ট হ্যান্ডেলার’। এরা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধী নয়, এরা একটি সুসংগঠিত ও ভয়ংকর অপরাধী চক্র।
হানি ট্র্যাপের মাস্টারমাইন্ড উৎপলের হাতে লাল গোলাপ: পরিচয় ও পটভূমি
ময়মনসিংহের পচা পুকুরপাড় এলাকার বাসিন্দা মো: শহীদুল ইসলাম উৎপল। বাইরে থেকে তাকে দেখলে মনে হয় একজন মার্জিত, সুভদ্র এবং রুচিশীল পুরুষ। পরনে দামী শার্ট, চোখে মার্জিত চশমা, আর হাতে প্রায়ই দেখা যায় একগুচ্ছ টাটকা লাল গোলাপ। এই গোলাপগুলো কেবল ভালোবাসার প্রতীক নয়, বরং এটি তার শিকার ধরার প্রথম অস্ত্র। এই গোলাপ হাতে সে যখন কোনো সম্ভ্রান্ত বা বিত্তবান নারীর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, তখন তার চোখে থাকে মায়ার এক গভীর সাগর। কিন্তু এই মায়ার আড়ালে যে এক জঘন্য শিকারি লুকিয়ে আছে, তা বোঝার সাধ্য কার?
তার এই প্রতারণার নাটকে সে একা নয়; তার সাথে রয়েছে তার পরিবারের এক সুসংগঠিত সিন্ডিকেট। উৎপলের মা, ভাই এবং বোনেরা মিলে তৈরি করেছে এক অদৃশ্য কারাগার। যখনই উৎপল কোনো নতুন শিকারকে টার্গেট করে, পরিবারের সদস্যরা তখন একেকজন দক্ষ কুশীলবের মতো মাঠে নেমে পড়ে। তারা এমনভাবে নাটক সাজায় যেন তাদের পরিবারটি শহরের সবচেয়ে আদর্শ পরিবার। তাদের এই সম্মিলিত অভিনয়ের তোড়জোড় এতটাই বাস্তবসম্মত যে, বাইরের মানুষ দূর থেকে হাততালি দিয়ে বাহবা দিতে থাকে—অথচ এই মেকি স্বর্গের ভেতরেই বাস করে নরক।
অর্থ-লালসার নীল নকশা (সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারীদের সর্বস্বান্ত করার নির্মম মহোৎসব)
উৎপলের অপরাধ সাম্রাজ্য কেবল মিথ্যে প্রেমের নাটকেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা ঢুকে পড়েছে মানুষের পবিত্রতম আবেগের অন্দরমহলে। কোন এক সুনির্দিষ্ট লালসার মরণফাঁদে ফেলে অত্যন্ত চতুরতার সাথে উৎপল ভুক্তভোগীদের ব্যক্তিগত জীবন, অর্থনৈতিক সম্পদ এবং ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

পর্যায়ক্রমে অন্ধ বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে জীবনের সমস্ত সঞ্চিত তহবিল, এমনকি সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য জমানো তহবিল থেকে শুরু করে ভুক্তভোগীদের সারাজীবনের উপার্জিত কোটি কোটি টাকা এবং সমস্ত ধনসম্পদ কৌশলে আত্মসাৎ করে তাঁদের সম্পূর্ণ পথে বসিয়ে দেয় সে। একজন স্বাবলম্বী মানুষের সরলতা ও আবেগকে পুঁজি করে তাঁকে এভাবে নিঃস্ব ও নিঃশেষ করে দেওয়ার ঘটনা সভ্য সমাজকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। গত ৪ জুন ২০২৬ তারিখে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এই চক্রের বিরুদ্ধে বিশ্বাসের অপব্যবহার, প্রতারণা ও অর্থ-সম্পদ গ্রাসের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ তাকে খুঁজতে গেলে সে আগেই খবর পেয়ে পালিয়ে যায়।
প্রশাসকের কক্ষে উন্মোচিত সত্য ও অগণিত নারীর দীর্ঘশ্বাস
শহীদুল ইসলাম উৎপল কোনো সাধারণ অপরাধী নয়; সে মূলত এক পেশাদার ও সিরিয়াল ‘হানি ট্র্যাপার’। এই ভয়াবহ লালসার ফাঁদ ও সর্বস্বান্তের শিকার হয়ে ভুক্তভোগীরা যখন তীব্র ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব নিয়ে মাননীয় প্রশাসক মহোদয়ের দপ্তরে হাজির হন, তখন বেরিয়ে আসে আরও এক রোমহর্ষক সত্য।
মাননীয় প্রশাসক মহোদয় ভুক্তভোগীদের বক্তব্য শুনে জানান যে, এই উৎপল একজন পেশাদার প্রতারক। এর লালসার শিকার আসলে অগণিত নারী! এই ভুক্তভোগীদের মধ্যে মাত্র চারজন নারী বিভিন্ন সময়ে এসে মাননীয় প্রশাসক মহোদয়কে জানানোর সুযোগ বা সাহস পেয়েছিলেন। বাকি অগণিত নারী লোকলজ্জা আর সামাজিক সম্মানের ভয়ে মুখ বুজে এই চরম অন্যায় সহ্য করেছেন, কিংবা পারিবারিকভাবে তিলে তিলে শেষ হয়ে গেছেন। আজ তাদের অনেকের কোনো খোঁজ আমরা জানিই না।
মাননীয় প্রশাসক মহোদয় এই জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করার ব্যাপারে পূর্ণ আশ্বাস দিয়েছেন। তবে উৎপল বা তার দোসররা হয়তো ভাবছে তারা পার পেয়ে যাবে। কিন্তু তারা ‘কাকের মাদ্রাসা’ থেকে লেখাপড়া করার কারণে এটা বুঝতে পারছে না—তারা আজ একজনকে প্রতিবাদ করতে দেখে শুধু এই একজনকেই ভাবছে; এর পেছনে যে এতগুলো নারীকে সে সর্বস্বান্ত করে এসেছে, তারা যে আজ একত্রিত হতে পারে, তা তার ধারণাতেও নেই।
