লোহার পাঁজরে ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস: সিআরবি’র এক বিস্মৃত উপাখ্যান

পলিন কাউসার

সময়টা ছিল উনবিংশ শতাব্দীর শেষ লগ্ন। ব্রিটিশ বণিকদের চোখে তখন এক নতুন স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্নের নাম ‘চা’। আসামের পাহাড়ি ঢালে লকলকিয়ে বেড়ে ওঠা সবুজ পাতাগুলোকে সমুদ্রের নোনা হাওয়া পাইয়ে দিতে হবে, পৌঁছে দিতে হবে সুদূর লন্ডনে। ঠিক এই বাণিজ্যিক ‘প্রয়োজনীয়তা’ থেকেই ১৮৯২ সালে জন্ম নিলো এক লোহার জাদুকর—আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে (ABR)। পাহাড় কেটে, অরণ্য চিরে শুরু হলো তার যাত্রা। কিন্তু এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ছিল এক রাজকীয় মস্তকের, এক জাঁদরেল সদর দপ্তরের।

সেই প্রয়োজনেই ১৮৯৭ সালে চট্টগ্রাম শহরের বুকে, প্রকৃতির নিবিড় আলিঙ্গনে শুরু হলো এক মহাকাব্যিক নির্মাণযজ্ঞ। তিলতিল করে গড়ে উঠল লাল ইটের এক বিস্ময়—সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং বা সিআরবি। দক্ষিণমুখী এই ভবনটি যখন আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়াল, তখন সে কেবল একটি অফিস ছিল না, ছিল ব্রিটিশ আভিজাত্যের এক মূর্ত প্রতীক।

কালের সাক্ষী: ‘ABR 1899’

আজ যখন আপনি এই ভবনের সামনে দাঁড়ান, তখন কি শুনতে পান সেই পুরনো দিনের ফিসফিসানি? ভারত ভাগ হয়েছে, মানচিত্র বদলেছে, ইস্টার্ন বেঙ্গল থেকে পাকিস্তান রেলওয়ে, আর শেষে বাংলাদেশ রেলওয়ে—কতবার মালিকানা হাতবদল হলো! কিন্তু ভবনের আত্মা? সে তো বিক্রি হয়নি। ভবনের চূড়ায় খোদাই করা এফিটাফ “ABR 1899” আজও কালের সাক্ষী হয়ে মুচকি হাসছে। শাসকের পর শাসক এসেছে, কিন্তু ১৮৯৯ সালের সেই নামফলক কেউ মুছে ফেলতে পারেনি। এটি আজও বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় মহাব্যবস্থাপকের কার্যালয় হিসেবে, যেন এক অটল পাহাড়।

ভবনটির ঠিক সামনেই ইতিহাসের আরেক বোবা কান্না হয়ে শুয়ে আছে একটি স্টিম ইঞ্জিন। নাম তার সিবি-০৮ (CB-08)। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ভলকান ফাউন্ড্রি থেকে জন্ম নেওয়া এই ন্যারোগেজ লোকোমোটিভটি আজ থেকে প্রায় ১৬০ বছর আগে যখন প্রথম ধোঁয়া ছেড়েছিল, তখন তার হুইসেলে কেঁপে উঠত বাংলা আর আসামের জনপদ। আজ সে জরাজীর্ণ, মৌন। অথচ এই প্রথম প্রজন্মের স্টিম ইঞ্জিনটি একসময় ছিল গতি আর শক্তির প্রতীক। তার চাকার দিকে তাকালে এখনো মনে হয়, এই বুঝি সে নড়ে উঠবে, এই বুঝি আবার যাত্রা শুরু করবে কোনো এক অজানার উদ্দেশ্যে।

স্থাপত্যের মুন্সিয়ানা

সিআরবি ভবনটি তো কেবল ইট-পাথরের স্তূপ নয়, এ এক স্থাপত্যের কবিতা। ৩৬০ ফুট লম্বা এর বিশাল বুক। ঠিক মাঝবরাবর ১২ ফুট চওড়া পোর্ট-কোচারটি যেন এক রাজকীয় অভ্যর্থনার জন্য বাড়িয়ে দেওয়া হাত।

চোখ বন্ধ করুন। কল্পনা করুন, আজ থেকে সোয়া একশো বছর আগের এক পড়ন্ত বিকেল। ধুলো উড়িয়ে ঘোড়ায় টানা সুদৃশ্য কোচে করে সাহেবরা আসছেন। পোর্ট-কোচারের সেই বিশাল ছাদ তাদের রোদ-বৃষ্টি থেকে আগলে রেখে পৌঁছে দিচ্ছে তোরণের ভেতরে।

পাঁচটি তোরণ দিয়ে সাজানো এই প্রবেশপথের প্রতিটি কোণে রয়েছে কর্বেলযুক্ত কারুকাজ। দেয়াল থেকে বেরিয়ে আসা এই কর্বেলগুলো যেন ভবনের অলংকার, যা একই সাথে ভার বহন করছে আবার সৌন্দর্যও বিলাচ্ছে। আর বিশাল দেয়ালগুলো যাতে সময়ের ভারে নুয়ে না পড়ে, তার জন্য পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে আছে বাট্রেস। এই ঠেস-দেয়ালগুলো বা বাট্রেস আছে বলেই শত বছরের ঝড়-ঝাপটা এই ভবনকে টলাতে পারেনি। সেসময়ের স্থপতিরা বাতাস চলাচলের যে ব্যবস্থা রেখেছিলেন, তা আজকের আধুনিক প্রকৌশলীদেরও ভাবিয়ে তোলে—এ এক অবিশ্বাস্য মুন্সিয়ানা!

বিস্মৃত ঐতিহ্য ও নীরবতা

কিন্তু হায়! ইতিহাসের এই জৌলুস কি আমরা ধরে রাখতে পারলাম?

চট্টগ্রাম রেলওয়ের পরিধি তো কেবল এই একটি ভবনে সীমাবদ্ধ ছিল না। টাইগার পাস থেকে পাহাড়তলী, কিংবা লালখান বাজারের পাহাড়গুলোর দিকে তাকালে বুকটা হাহাকার করে ওঠে। সিআরবি ছাড়াও এই বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য পরিত্যক্ত বাংলো। একসময় হয়তো কোনো রেল কর্মকর্তার পরিবারের হাসিকান্নায়, পিয়ানোর সুরে কিংবা চায়ের আড্ডায় মুখর ছিল এই বাড়িগুলো। আজ সেখানে শুধুই লতা-পাতার জঙ্গল, ভুতুড়ে নিস্তব্ধতা আর ‘Abandoned’ সাইনবোর্ড।

বড় আক্ষেপ হয়! সিডিএ (Chittagong Development Authority) বা নগর পিতাদের চোখে কি এই ক্ষয়ে যাওয়া ইতিহাস ধরা পড়ে না? আমাদের তথাকথিত সুশীল সমাজ, যারা ড্রয়িংরুমে বসে ইতিহাস চর্চা করেন, তারা কেন এই রত্নগুলো রক্ষায় আজ নীরব? প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বা জাতীয় জাদুঘর—সবাই যেন কুম্ভকর্ণের ঘুমে আচ্ছন্ন। Historic Preservation বা ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের সংস্কৃতি এই দেশে আজও গড়ে উঠল না। আমরা ভুলে যাই, এই ভবনগুলো আমাদের অতীত, আমাদের শেকড়। আমাদের এই চরম অযত্ন আর অবহেলায় একদিন হয়তো এই পুরনো স্থাপনাগুলো মাটির সাথে মিশে যাবে। আর সেদিন? সেদিন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাস মানে হবে কেবল পাঠ্যবইয়ের নিরস কালো অক্ষর।

সিআরবি’র ওই লাল ইটের দিকে তাকিয়ে দেখুন, ওগুলো কেবল ইট নয়, ওগুলো আমাদের ইতিহাসের জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *