ফুটবল খেলাও দেখবো, দেশগুলোর ইতিহাসও জানবো

—মোশাররফ হোসেন মুসা

জাতিসংঘ স্বীকৃত বিশ্বে মোট দেশের সংখ্যা ১৯৩টি (পর্যবেক্ষণে আছে ২টি)। প্রতিটি দেশের আলাদা আলাদা ইতিহাস-ঐতিহ্য, ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি, জলবায়ু ও নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে মানুষের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের বহু ঘটনা। সেজন্য কার্ল মার্কস বলেছেন— “মনুষ্য জীবনের ইতিহাস শ্রেণি দ্বন্দ্বের ইতিহাস”। বর্তমানে ফুটবলের বড় আসর বিশ্বকাপ চলছে। বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে এইবারই প্রথম তিনটি দেশ খেলা আয়োজন করেছে; যথা— যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। গত ১১ জুন একই সাথে তিনটি দেশে উদ্বোধন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবার খেলার মূল থিম হলো ভেদাভেদ ভুলে মানুষকে এক সুতায় গাঁথা। যুক্তরাষ্ট্রে ৭৮টি ম্যাচ, মেক্সিকো ও কানাডায় ১৩টি করে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে৷

ফুটবল খেলা জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে রয়েছে স্বল্প সময়ে খেলা শেষ হওয়া, সার্বজনীনতা, সহজ নিয়ম, শৈল্পিক শারীরিক কসরত ইত্যাদি। ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে সমগ্র বিশ্বের ক্রীড়ামোদী লোকজন, বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে বিশেষ ধরনের আবেগ সৃষ্টি হয়েছে। তারা রাত জেগে খেলা দেখছে। তাদের অনেকেই ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, স্পেন, ইরান প্রভৃতি দেশের কট্টর সমর্থক হয়েছেন। খেলা নিয়ে তর্কাতর্কি, হাতাহাতি, এমনকি পাড়ায় পাড়ায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ পর্যন্ত ঘটতে দেখা যায়। অথচ অধিকাংশ মানুষ দেশগুলোকে চেনেন না, ইতিহাসও জানেন না। তবে খেলার প্রতি আবেগ মানুষের সুস্থতার লক্ষণ। এই সুযোগে যদি প্রতিটি দেশের ইতিহাস সম্পর্কে মানুষকে অবগত করানো সম্ভব হতো, তাহলে অন্ধ জাতীয়তা, ধর্মীয় গোঁড়ামো, সংকীর্ণতা, কূপমণ্ডূকতা সহ যাবতীয় ক্ষুদ্রতার অনেকাংশই দূর হয়ে যেতো (এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যম ও জাতীয় পত্র-পত্রিকাগুলো ভূমিকা রাখতে পারে)।

মানব সভ্যতার ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতা

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেছেন— হোমো সেপিয়েন্স মানুষের বয়স প্রায় তিন লাখ বছর। তবে लिखित ইতিহাস পাওয়া যায় প্রায় ৬ হাজার বছর পূর্বের। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকরা অনুসন্ধান করে প্রায় ১০ লাখ বছর পূর্বের মানুষের ব্যবহার্য সামগ্রীর নিদর্শন আবিষ্কার করে ইতিহাস পুনর্লিখনে সহযোগিতা করছেন। বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশ ধনী, কোনো দেশ অতি দরিদ্র কিংবা কোনো দেশ পরাধীন। বলা হয়, যেসব দেশ সাম্রাজ্য বিস্তারে সক্ষম ছিল, তথা যেসব দেশ অন্য দেশকে লুটপাট করতে পেরেছে, তাদের দেশের লোকজনই আগে सभ্য হতে পেরেছে (জমিদারের সন্তানদের উচ্চ শিক্ষিত হওয়ার মতো)।

ইউরোপের বহু দেশ ঔপনিবেশিক শক্তির মালিক ছিল। এককথায় যেসব দেশ পরাধীন হয়নি, সেসব দেশের জনগণের সংস্কৃতি এবং যেসব দেশ পরাধীন ছিল, সেসব দেশের সংস্কৃতির ভিন্নতা দেখা যায়। যেমন— ভারতীয় উপমহাদেশ বহু কাল বহির্শক্তির অধীনে ছিল। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আমূল পরিবর্তন হয়নি এবং ভাষাও বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। কিন্তু স্পেন ১০/১২ হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ তথা মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা, চিলি প্রভৃতি দেশ শুধু দখলই করেনি, সেসব দেশের আদিবাসীদের বিতাড়িত করেছে এবং তাদের সভ্যতা ধ্বংস করেছে (আর্জেন্টিনার প্রখ্যাত ফুটবলার মেসির দ্বিতীয় বাড়ি স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে)। ফলে দক্ষিণ আমেরিকার অধিকাংশ দেশের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন ঘটেছে এবং ভাষা পরিবর্তন হয়ে স্প্যানিশ ভাষা হয়ে গেছে।

সংক্ষেপে কয়েকটি দেশের ইতিহাস নিচে তুলে ধরা হলো—

উত্তর আমেরিকার তিন আয়োজক দেশ

১) যুক্তরাষ্ট্র: ১৪৯২ সালে স্পেনের রানীর সহযোগিতায় ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেন। যুক্তরাষ্ট্রে মূলত আদিবাসীদের বসতি ছিল। দেশটির আবিষ্কার হওয়ার পরপরই স্পেন, ফ্রান্স, ব্রিটিশ, পর্তুগালের মানুষজন বসতি স্থাপন শুরু করে। তারা বিভিন্ন দেশ থেকে দাস ক্রয় করে এনে চাষাবাদ ও ব্যবসা শুরু করে। একসময় বড় শক্তি ব্রিটিশ সকলকে তাড়িয়ে নিজেই দেশটি দখল করে নেয়। ব্রিটিশদের মাত্রাতিরিক্ত কর ও শোষণের প্রতিবাদে জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই স্বাধীনতা ঘোষিত হয়। আবার ১৮৬১-১৮৬৫ সালে দাস প্রথার পক্ষে-বিপক্ষে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে দাসপ্রথার বিলুপ্তি ঘটে। মজার বিষয় হলো, আব্রাহাম লিংকন ছিলেন রিপাবলিকান দলের নেতা কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা ছিল তার বিরুদ্ধে, তথা দাস প্রথার পক্ষে। বর্তমানে উভয় দলই দাস প্রথার বিরুদ্ধে এবং রিপাবলিকান দল হয়ে পড়েছে রক্ষণশীল। দেশটি পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করছে। বলা যায়, দেশটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের উত্তরাধিকার বহন করছে।

২) মেক্সিকো: মেক্সিকো উত্তর আমেরিকার একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র। জনসংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি। পূর্বে এ দেশে অ্যাজটেক, মায়া, জাপোটেক, মিক্সটেক, ওলমেক নামে আদিবাসী ছিল। ১৫২১ সালে অ্যাজটেক সাম্রাজ্য ধ্বংস করে স্পেন দেশটি দখল করে নেয়। বর্তমানে প্রায় ৯৮% মানুষ স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে। দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। দেশটির মাথাপিছু আয় যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে কয়েকগুণ কম হওয়ায় প্রতিবছর সীমান্ত দিয়ে বহু মেক্সিকান অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অনুপ্রবেশ করে থাকে।

৩) কানাডা: উত্তর আমেরিকা মহাদেশে অবস্থিত। জনসংখ্যা ৪ কোটি ১০ লাখ। এ দেশটির সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। দেশটি উন্নত হওয়ায় এ দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটে না। এ দেশটি পূর্বে ব্রিটিশের উপনিবেশ ছিল। শান্তিপূর্ণ উপায়ে স্বাধীন হওয়ায় ব্রিটেনের रानी বা রাজাকে এখনো রানী/রাজা হিসেবে মান্য করা হয়।

পানামা ও ঘানার সংক্ষিপ্ত বিবরণ

৪) পানামা: উত্তর আমেরিকার একটি ছোট দেশ। জনসংখ্যা মাত্র ৪৫ লাখ। এ দেশটিও স্পেনের দীর্ঘ উপনিবেশের অধীনে ছিল। শেষে কলম্বিয়া থেকে ১৯০৩ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। দেশটি পানামা খালের জন্য আলোচিত। পানামা খাল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির বিরোধ রয়েছে।

৫) ঘানা: আফ্রিকা মহাদেশের একটি দেশ। জনসংখ্যা ৩ কোটি ৫০ লাখ। দেশটি একসময় দাস ব্যবসার কেন্দ্রস্থল ছিল। ব্রিটিশ থেকে ১৯৫৭ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। রাষ্ট্রীয় ভাষা ইংরেজি।

দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল পরাশক্তিদ্বয়

৬) আর্জেন্টিনা: দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের একটি দেশ। দেশটি দীর্ঘকাল স্পেনের কলোনি ছিল। জনসংখ্যা ৪ কোটি ৭০ লাখ। দেশটি স্পেন থেকে ১৮১৬ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। রাষ্ট্রীয় ভাষা স্প্যানিশ।

৭) ব্রাজিল: দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের একটি দেশ। দেশটির জনসংখ্যা ২১ কোটি ৫০ লাখ। দেশটি পর্তুগালের অধীনে ছিল। রাষ্ট্রীয় ভাষা পর্তুগিজ।

ইউরোপের শক্তিসমূহ

৮) ইংল্যান্ড: ইউরোপ মহাদেশের একটি দেশ। দেশটি কখনো কোনো দেশের অধীনে ছিল না। জনসংখ্যা ৫ কোটি ৭০ লাখ। ভাষা ইংরেজি।

৯) ফ্রান্স: ইউরোপের একটি দেশ। জনসংখ্যা ৬ কোটি ৮০ লক্ষ। এ দেশটিও পরাধীন ছিল না। রাষ্ট্রীয় ভাষা ফরাসি।

১০) জার্মানি: ইউরোপের একটি দেশ। এ দেশটিও পরাধীন ছিল না। জনসংখ্যা ৮ কোটি ৪০ লাখ। ১৮৭১ সালে দেশটি একত্রীকরণ হয়।

১১) স্পেন: এ দেশটির সাম্রাজ্য বিস্তারের ইতিহাস রয়েছে। লোকসংখ্যা ৪ কোটি ৯০ লাখ।

১২) নেদারল্যান্ডস: ইউরোপের একটি দেশ। এদেশটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে ইউনিয়নভুক্ত ছিল। লোকসংখ্যা ৮০ লাখ। স্বল্প সময় স্পেনের অধীন ছিল।

১৩) ক্রোয়েশিয়া: ইউরোপের একটি দেশ। ১৯৯১ সালে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে ৭টি স্বাধীন দেশ হয়। তার মধ্যে এদেশ একটি। লোকসংখ্যা ৩৯ লাখ।

ওশেনিয়া ও এশিয়ার দেশসমূহ

১৪) অস্ট্রেলিয়া: ওশেনিয়া মহাদেশের একটি দেশ। জনসংখ্যা ২ কোটি ৭০ লক্ষ। এ দেশটি ব্রিটিশের অধীনে ছিল। আলোচনার মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করায় আজও ব্রিটেনের রাজাকে নিজ দেশের রাজা মনে করা হয়।

১৫) জাপান: এশিয়া মহাদেশের একটি দেশ। জনসংখ্যা ১২ কোটি ৩০ লক্ষ। এদেশটিও একসময় সাম্রাজ্যবাদী দেশ ছিল। পরাধীন থাকার ইতিহাস নেই।

১৬) সৌদি আরব: এশিয়া মহাদেশের একটি দেশ। জনসংখ্যা ৩ কোটি ৮০ লক্ষ। দেশটি উপনিবেশের অধীনে ছিল না। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ওসমানীয় সাম্রাজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে ১৯৩২ সালে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট নিয়ে সৌদ পরিবার ক্ষমতা দখল করে। রাষ্ট্রীয় ভাষা আরবি।

১৭) ইরান: এশিয়া মহাদেশের একটি দেশ। জনসংখ্যা প্রায় ৯ কোটি। রাষ্ট্রীয় ভাষা ফার্সি। জাতিগত পরিচয় পার্সিয়ান মুসলমান (প্রায় ৯৫% শিয়া সম্প্রদায়)। এ দেশটিও একসময় সাম্রাজ্যবাদী দেশ ছিল। পরাধীন থাকার ইতিহাস নেই৷ ইরান দেশের অধিকাংশ নাগরিকের ধর্ম, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, ভাষা, সংস্কৃতি অভিন্ন হওয়ায় তারা ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত হতে পেরেছে। ফলে পরাক্রমশালী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে তারা বিভক্ত হয়নি।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *