নীরব ত্যাগের অদৃশ্য অধ্যায়

মির্জা মাহমুদা আক্তার মুন

মানুষের জীবন সম্পর্কের বুননে গাঁথা। বন্ধুত্ব আসে, প্রেম আসে, স্বার্থের হিসাব কষে কেউ কেউ পাশে থাকে, সময় ফুরালে সরে যায়। পৃথিবীর প্রায় সব সম্পর্কই একদিন শিথিল হয়ে পড়ে। স্বামী-স্ত্রীর মন্ত্রপড়া সম্পর্কও কখনো কখনো আইনি কাগজে এসে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু একটি সম্পর্ক আছে, যা জন্মের প্রথম কান্নায় শুরু হয়ে মৃত্যুর পরও ফুরায় না—পিতা-মাতার সম্পর্ক।

এই সম্পর্কের কোনো চুক্তিপত্র নেই, নেই লাভ-লোকসানের হিসাব। আছে শুধু রক্ত, ত্যাগ আর নীরব দায়িত্ববোধের অদৃশ্য সুতো।

প্রজন্মের ব্যবধান ও অদৃশ্য বন্ধন

প্রায় ত্রিশ বছরের ব্যবধান নিয়ে যে সন্তান পৃথিবীতে আসে, সে-ই একদিন হয়ে ওঠে পিতা-মাতার সমস্ত স্বপ্নের কেন্দ্র। এক যুগের মানুষ আরেক যুগের সন্তানকে লালন করেন। পিতা নব্বইয়ের দশকের ক্যাসেটের গান শোনেন, সন্তান ডুবে থাকে ফেসবুক রিলসে। পিতা চিঠি লিখতে জানেন, সন্তান অভ্যস্ত দ্রুত মেসেজে। তবু এই দূরত্ব পেরিয়েও পিতা সন্তানের ভাষা বোঝেন; সন্তানের চোখ দেখেই বুঝে নেন—সে কষ্টে আছে।

যে হাত একদিন মায়ের আঁচল আঁকড়ে ধরেছিল, সময়ের সাথে সেই হাতই হয়ে ওঠে বৃদ্ধ বাবার ভরসা। সন্তান বড় হয়, আর বাবা-মা বয়সের ভারে নীরব হয়ে যান—এ এক অদ্ভুত জীবনচক্র।

বাবার সংগ্রাম ও নিঃশব্দ যুদ্ধ

বাবা মানে মধ্যবিত্ত জীবনের এক নীরব সংগ্রাম। মাস শেষে বেতনের খাম খোলার আগে যে মানুষটি নিজের নামটি হিসাবের খাতা থেকে মুছে ফেলেন। সন্তানের বই, জামা, খরচ—সব মিটিয়ে যদি কিছু থাকে, তবে নিজের প্রয়োজনের কথা ভাবেন। নিজের জন্য একটি পাঞ্জাবি কেনা পিছিয়ে যায় ঈদের পর ঈদ।

তিনি সবার আবদার, বায়না, চাপ নীরবে বহন করেন। কিন্তু নিজের কোনো টেনশন, কষ্ট বা ছোটখাটো ইচ্ছাও কখনো প্রকাশ করেন না। নিজের ভেতরের ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা সবই বুকের ভেতর চাপা দিয়ে রাখেন।

অফিসের চাপ, সংসারের দায়, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা—সব তিনি নীরবে সহ্য করেন। তারপর বাড়ি ফিরে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করেন, “আজ ক্লাস কেমন হলো?”

এই হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকে বহু রাতের নিঃশব্দ যুদ্ধ। বাবা তাই শুধু অভিভাবক নন, তিনি এক নীরব স্থপতি—যিনি নিজের জীবন ভেঙে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন।

ব্যস্ততার শহর ও অনুভবের আঙিনা

আমরা বড় হই, শহরে যাই, ব্যস্ততার ভিড়ে ডুবে যাই। ফোনের স্ক্রিনে সময় কাটে, আর বাবার নাম পড়ে থাকে অজানা নীরবতায়। আমরা ভুলে যাই—আজ আমরা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখি, তার ভিত্তি বহু বছর আগে একজন বাবার কাঁধে স্থাপিত হয়েছিল।

পিতা-মাতার ভালোবাসা ব্যাখ্যা করতে গেলে ভাষা হার মানে। সে ভালোবাসা শুধু অনুভবের বিষয়। আর যে মানুষ তা অনুভব করতে শিখেছে, সে-ই বুঝেছে মানুষ হওয়ার মানে কী।

আমরা সবাই একদিন বাবা-মা হবো। সেদিন বুঝবো, সন্তানের এক ফোঁটা চোখের জল মুছতে গিয়ে বাবার চোখের কোণ কেন ভিজে ওঠে। সন্তানের সামান্য জ্বরেও মা-বাবার সারারাত ঘুম আসে না।

সেদিন যেন আর দেরি না হয়। ব্যস্ততার দেয়াল যেন সম্পর্কের দূরত্ব না বাড়ায়। ত্রিশ বছরের ব্যবধান যেন কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা ও সম্মানের কাছে শূন্য হয়ে আসে।

উৎসর্গ

আমার প্রথম আদর্শ, আমার জীবনের প্রধান শিক্ষক, আমার শ্রদ্ধেয় বাবা জনাব মির্জা আনোয়ার হোসেন-এর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক এবং আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা। গত মাসে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর শিক্ষা, মূল্যবোধ এবং ভালোবাসা আজও আমার প্রতিটি শ্বাসে, প্রতিটি চিন্তায় এবং প্রতিটি অক্ষরে বেঁচে আছে।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *