দুটি ধর্ষণের ঘটনা ও অকার্যকর স্থানীয় সরকার
মোশাররফ হোসেন মুসা

গত তিন দিনের ব্যবধানে দেশের দুই প্রান্তে দুটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেল, যা আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা ও স্থানীয় বিচার ব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপটি উন্মোচিত করেছে।
নরসিংদী ও পাবনার নির্মমতা: বিচার চাওয়াই যখন কাল
প্রথম ঘটনাটি নরসিংদীর মহিষাশুড় ইউনিয়নে। ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হলো কেবল বিচার চাওয়ার অপরাধে। বখাটে নূরের বিরুদ্ধে সাবেক মেম্বর আহম্মদ আলীর কাছে বিচার চেয়েছিলেন ভুক্তভোগীর বাবা। কিন্তু বিএনপি নেতা ও সাবেক মেম্বর আহম্মদ আলী আসামী পক্ষের থেকে টাকা খেয়ে আপোষরফা করে পরিবারটিকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেন। এই বিচারহীনতার সুযোগেই বখাটেরা কিশোরীটিকে অপহরণ করে হত্যা করে।
অন্যদিকে, পাবনার দাশুড়িয়ায় দাদীকে হত্যা করে নাতনীকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ শেষে হত্যার পর বিবস্ত্র অবস্থায় সর্ষে ক্ষেতে ফেলে রাখা হয়েছে। দুটি ঘটনাই ঘটেছে প্রান্তিক গ্রাম এলাকায় এবং দুটি পরিবারই আর্থিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল। যা দেখে মনে হয়, এ দেশে ‘গরিব হওয়াটাই যেন সবচেয়ে বড় অপরাধ’।
স্থানীয় সরকারের বর্তমান ‘হ-য-ব-র-ল’ অবস্থা
বর্তমানে দেশের অধিকাংশ সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি বা চেয়ারম্যান নেই। দাশুড়িয়া ইউনিয়নে একজন অফিসার প্রশাসকের দায়িত্বে আছেন। মেম্বররা দায়িত্ব পালন করছেন না, গ্রাম পুলিশও নিষ্ক্রিয়। একদিকে নতুন সরকার, অন্যদিকে গত ১৮ মাসের নৈরাজ্যকর শাসনের রেশ—সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকারগুলোতে এক চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। বাড়ির কাছের এই সরকারগুলো অকার্যকর হওয়ায় অপরাধীরা আজ বেপরোয়া।
মোগল-ব্রিটিশ আমল বনাম বর্তমান বাস্তবতা
মোগল ও ব্রিটিশ আমলে জমিদার বা পঞ্চায়েত শাসনের ভয়ে অপরাধীরা ভীত থাকতো। তৎকালীন পঞ্চায়েতের স্থলে আজ ইউনিয়ন পরিষদ এসেছে, ক্ষমতা বেড়েছে কিন্তু গণতান্ত্রিক রূপ আসেনি। ইউনিয়ন পরিষদকে ১০টি বাধ্যতামূলক ও ৩৬টি ঐচ্ছিক দায়িত্ব দেওয়া থাকলেও একক ক্ষমতা না থাকায় উন্নয়ন ও বিচার ব্যবস্থা—উভয়ই এখন উপরমুখী বা কেন্দ্রমুখী। ফলে স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষুদ্র বিবাদগুলো উচ্চ আদালত পর্যন্ত যাচ্ছে, যেখানে সত্যের চেয়ে মিথ্যার চর্চাই বেশি হয়।
প্রস্তাবনা: ‘ইউনিয়ন সরকার ব্যবস্থা’র প্রবর্তন
সামাজিক বন্ধন রক্ষা ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন পরিষদে প্রজাতান্ত্রিক রূপ তথা ‘ইউনিয়ন সরকার ব্যবস্থা’ বাস্তবায়ন করা জরুরি। আমার প্রস্তাবিত কাঠামোটি হবে নিম্নরূপ:
- ইউনিয়ন সংসদ: নীতি নির্ধারণ ও উন্নয়ন প্রস্তাব পাস করবে।
- ইউনিয়ন প্রশাসন: চেয়ারম্যান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে সংসদীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবেন।
- ইউনিয়ন আদালত: চেয়ারম্যান-মেম্বররা সরাসরি বিচার করবেন না; বরং একজন নিরপেক্ষ ও সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তি বিচার কাজ সম্পন্ন করবেন।
একই নিয়মে জেলা সরকার, নগর সরকার ও উপজেলা সরকার পরিচালিত হলে তবেই প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ ও জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত হবে।
নাগরিকরা সরাসরি ইউনিয়ন বা পৌরসভায় বসবাস করেন। বিপদে পড়লে মানুষ প্রথম মেম্বর বা কাউন্সিলরের কাছেই ছুটে যায়। কাজেই দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনের স্বার্থে স্থানীয় সরকারগুলোর নির্বাচন দ্রুত সম্পন্ন করা এবং সেগুলোতে প্রকৃত গণতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রদান করা এখন সময়ের দাবি।
