চান্দগাঁওয়ে অবৈধ প্লাস্টিক কারখানার দূষণে বিপন্ন জনস্বাস্থ্য; বন্ধের দাবিতে ডিসির কাছে অভিযোগ

বাংলাদেশ

বিশেষ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও থানার হাজিরপুল মাইজপাড়া এলাকায় আবাসিক পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের তোয়াক্কা না করে অনিয়ম ও পরিবেশ দূষণের অভয়ারণ্য গড়ে তুলেছে ‘খাজা প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রি’ (ইউনিট-১ ও ইউনিট-২)।

​হাসপাতালের সংক্রামক বর্জ্য ও বিষাক্ত প্লাস্টিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, নিরাপত্তাহীন পরিবেশে শিশু ও নারী শ্রমিক নিয়োগ এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া অবৈধভাবে কারখানা পরিচালনার অভিযোগে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক (ডিসি) বরাবর একটি লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। জনস্বার্থে সরজমিন পরিদর্শন শেষে অনুসন্ধানী কাজের অংশ হিসেবে দৈনিক ‘এই বাংলা’ পত্রিকার সংবাদকর্মী রাহাত খান এই অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম

​অভিযোগপত্র সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় মো. জুবায়ের (পিতা: বদিউল আলম) দীর্ঘদিন ধরে আবাসিক এলাকায় ‘খাজা প্লাস্টিক’ পরিচালনা করে আসছেন। কারখানায় প্লাস্টিক ও বোতল ক্র্যাশিং এবং রিসাইক্লিং বর্জ্য কোনো আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়াই খোলা জায়গায় ফেলা হচ্ছে। এতে আশপাশের মাটি, পানি ও বায়ুতে মারাত্মকভাবে বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়ছে।

​পরিদর্শনকালে দেখা যায়, কোনো প্রকার মাস্ক বা গ্লাভসের মতো সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়াই শিশু ও নারী শ্রমিকদের দিয়ে প্লাস্টিক ভাঙার ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো হচ্ছে। প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় নির্গত বিষাক্ত গুঁড়ো ও ধোঁয়ায় শ্রমিকরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন, যা দেশের শ্রম আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।

হাসপাতালের সংক্রামক বর্জ্য ভাঙার গুরুতর অভিযোগ

​সবচেয়ে আশঙ্কাজনক অভিযোগ হলো, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কঠোর বিধিমালা উপেক্ষা করে এই কারখানায় বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে সংগৃহীত সংক্রামক চিকিৎসাবর্জ্য—যেমন ব্যবহৃত ইনজেকশন সিরিঞ্জ ও স্যালাইনের বোতল—ক্র্যাশিং করা হচ্ছে। খোলা জায়গায় এসব সংক্রামক বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করায় পুরো এলাকায় জটিল ও সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

​অনুসন্ধানের সময় কারখানা কর্তৃপক্ষ কোনো বৈধ পরিবেশগত ছাড়পত্র, ফায়ার লাইসেন্স বা প্রয়োজনীয় আইনি অনুমোদন দেখাতে পারেনি। উল্টো পরিবেশ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে এবং স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের আশ্রয়ে কারখানা পরিচালনা করছেন বলে দাবি করেছেন।

জেলা প্রশাসকের কাছে ৮ দফা দাবি

​জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ চেয়ে ৮টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • ​ঘটনার জরুরি ও দ্রুত সরজমিন তদন্ত পরিচালনা করা।
  • ​কারখানার পরিবেশগত ছাড়পত্রসহ অন্যান্য সব আইনি নথিপত্র পরীক্ষা করা।
  • ​হাসপাতাল বর্জ্য ও ব্যবহৃত সিরিঞ্জ ক্র্যাশিংয়ের বিষয়টি কঠোরভাবে খতিয়ে দেখা।
  • ​নির্গত বর্জ্য, তরল ও মাটির নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাব পরীক্ষার ব্যবস্থা করা।
  • ​ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশু ও নারী শ্রমিক ব্যবহারের বিষয়ে আইনি তদন্ত করা।
  • ​পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের সত্যতা মিললে কারখানা সিলগালাসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।
  • ​পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তার অনৈতিক যোগসাজশ আছে কি না তা নিরপেক্ষ তদন্ত করা।
  • ​জনস্বার্থে তদন্ত চলাকালেই দূষণ বন্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

​আবাসিক এলাকার পরিবেশ রক্ষায় এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতে স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ ও পরিবেশবাদীরা জেলা প্রশাসকের দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপ দাবি করেছেন।