“অপু, শিগগির আয়! রেলগাড়ি আসছে!” – দুর্গা

পলিন কাউসার

​“মেশিন হইতে টং করিয়া একটা শব্দ হইল। নীলমণি পড়িল। স্টেশন মাস্টার সেই নীলমণি ড্রাইভারের হাতে না দিলে গাড়ি এক পা-ও নড়িবে না… এই নীলমণিই যেন ট্রেনের প্রাণ।”

​​অপুর বিস্ময়মাখা চোখের সেই

নীলমণি’—কেতাবি ভাষায় যার নাম ‘নিলস বল টোকেন’ (Neale’s Ball Token)—আজ অচল। যে নীলমণি ছাড়া একসময় ট্রেনের চাকা একচুলও নড়ত না, যা ছিল ট্রেনের ‘প্রাণ’, আজ তা পাহাড়তলীর এক পরিত্যক্ত ভবনের কোণায় ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে।
​ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে দিই ১২৯ বছর। ১৮৯৫ সাল। ৩রা নভেম্বর। শীতের আড়মোড়া ভাঙা এক কুয়াশাভেজা সকাল।
​চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে প্রথমবারের মতো কুমিল্লার উদ্দেশ্যে হুইসেল বাজিয়ে নড়ে উঠল ‘আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে’র একটি মিটারগেজ বাষ্পীয় ইঞ্জিন। পাহাড়তলীর যে গহীন অরণ্যে কদিন আগেও কেবল রয়েল বেঙ্গল টাইগারের হুঙ্কার আর বুনো হাতির পালের দাপট ছিল, সেখানে প্রতিধ্বনিত হলো এক যান্ত্রিক দানবের তীক্ষ্ণ চিৎকার—‘কু… ঝিক ঝিক’ ‘কু… ঝিক ঝিক’…..
​ট্রেনের প্রথম শ্রেণীর সেলুনে বসে তখন জানলার বাইরে তাকিয়ে তৃপ্তির হাসি হাসছিলেন মি. আর. এ. ওয়ে (Mr. R.A. Way)। তিনি কেবল একজন ব্রিটিশ সাহেব নন, তিনি ছিলেন আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের তৎকালীন চিফ ইঞ্জিনিয়ার এবং এজেন্ট। তার দীর্ঘদিনের ঘাম, নকশা আর জেদের ফসল এই ১৫০ কিলোমিটারের রেলপথ। সেদিন বাষ্পীয় ইঞ্জিনের কয়লা পোড়া ধোঁয়ায় রচিত হয়েছিল যে ইতিহাস, আজ পাহাড়তলীর মাটিতে তা ধুলোয় লুটোপুটি খাচ্ছে।
​যে পাহাড়তলীকে ঘিরে মি. ওয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন রেলের এক বিশাল সাম্রাজ্যের, আজ সেখানে দাঁড়িয়ে কান পাতলে শোনা যায় –
“​দুর্গার সেই ডাক আর কাশবনের বুক চিরে ভাই-বোনের সেই দৌড়। রেলগাড়ি মানেই বাঙালির কাছে এক অপার বিস্ময়। আর সেই বিস্ময়ের চূড়ান্ত মুহূর্তটি ছিল যখন স্টেশন মাস্টারের হাতে ‘টং’ করে একটি নীল রঙের লোহার বল পড়ত। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর লেখায় এই বলটিকে পরম মমতায় নাম দিয়েছিলেন ‘নীলমণি’”।

সাহেবদের বাংলো থেকে ভুতুড়ে বাড়ি

পাহাড়তলী রেলওয়ে ক্যারেজ ও ওয়াগন কারখানার ঠিক সামনেই ১২ একর টিলার ওপর দাঁড়িয়ে আছে ৪,২০০ বর্গফুটের এক দোতলা ভবন। ১৯শ শতকের শেষলগ্নে চুন-সুরকি আর ওড ম্যাটেরিয়ালে তৈরি এই ভবনটি ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। এটি সাধারণ কোনো বাড়ি ছিল না; এটি ছিল রেলওয়ের সর্বোচ্চ কর্মকর্তাদের ‘পরিদর্শন বাংলো’
​১৯৪২ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। জাপানিরা বার্মায় হানা দিয়েছে, ভয়ে কাঁপছে চট্টগ্রাম। সেই উত্তাল সময়েও এই বাংলোর বারান্দায় বসে রেলওয়ের কর্মকর্তারা যুদ্ধের রসদ পরিবহনের ছক কষতেন। ১৯৪২-এ আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে, ১৯৪৭-এ ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে এবং ১৯৬১-তে পাকিস্তান রেলওয়ে—তিনটি ভিন্ন শাসনামল, তিনটি ভিন্ন পতাকা বদলেছে, কিন্তু এই ভবনটি ছিল ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। অথচ আজ? আজ সেখানে শুধুই জরাজীর্ণতা আর নেশাখোরদের আড্ডা। দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকলে মনে হয়, ইতিহাস এখানে খুন হয়েছে।

​অনাদরে পড়ে থাকা অপু-দুর্গার সেই বিস্ময়

জাদুঘরের ভেতরে ঢুকলে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠবে। এক কোণায় বেহাত হয়ে যাওয়া প্রেমিকার মতো অনাদরে পড়ে আছে সেই ঐতিহাসিক ‘নীলমণি’ যন্ত্রটি। আজকের ফাইবার অপটিক্সের যুগে দাঁড়িয়ে বিশ্বাস করা কঠিন যে, একসময় ট্রেনের সংঘর্ষ এড়াতে এবং লাইন ক্লিয়ার দিতে স্টেশন মাস্টারের একমাত্র ভরসা ছিল এই যন্ত্র। অপু হয়তো অবাক হয়ে ভাবত, এই লোহার বলটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ট্রেনের চলার জাদু।
​পাশে পড়ে আছে একচক্ষু দানবের মতো সিগন্যাল লাইটগুলো, যেগুলো একসময় কেরোসিন তেলের আলোয় কুয়াশা ভেদ করে ট্রেনকে পথ দেখাত। সেখানে পড়ে থাকা এনালগ টেলিফোনটির দিকে তাকালে গা শিউরে ওঠে। মনে হয়, এখুনি রিং হয়ে উঠবে এবং ওপাশ থেকে কোনো এক স্টেশন মাস্টার চিৎকার করে বলবেন, “লাইন ক্লিয়ার! ট্রেন ছেড়ে দিন!” কিন্তু না, কিছুই বাজে না। ব্রিটিশ আমলের ট্র্যাক সুইচ, স্টেশন মাস্টারের জাঁদরেল পোশাক, পিতলের ঘণ্টা—সবই এখন ধুলোর আস্তরণ গায়ে মেখে মৃত্যুর প্রহর গুনছে।

১৭ লক্ষ টাকার আফসোস

সবচেয়ে বেদনাদায়ক তথ্যটি শুনলে আপনার বিবেক দংশন করবে। কিছুদিন আগে ‘ডেইলি স্টার’-এর এক জার্নালে উল্লেখ করা হয়, মাত্র ১৭ থেকে ২২ লক্ষ টাকা—হ্যাঁ, মাত্র এইটুকু বাজেটের অভাবেই নাকি থমকে আছে এই জাদুঘরটির পুনর্জীবন। যেখানে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতির স্রোতে ভেসে যায়, সেখানে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল রেলের ইতিহাস রক্ষার জন্য এই সামান্য অর্থের জোগান হয় না? এটি কি কেবল অবহেলা, নাকি আমাদের জাতীয় স্মৃতির প্রতি এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা?
​পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে, এমনকি আমাদের প্রতিবেশী ভারতেও রেল মিউজিয়ামগুলো এক একটি জীবন্ত পাঠশালা। আর আমাদের দেশের একমাত্র রেল জাদুঘরটি নিজেই এখন একটি ‘মিউজিয়াম পিস’ হয়ে ধ্বংসের অপেক্ষায়।

মুক্তির দায়ভার

লেখাটি যখন শেষ করছি, তখন পাহাড়তলীর সেই পরিত্যক্ত টিলার ওপর সন্ধ্যা নামছে। জরাজীর্ণ ভবনটি আজ এক নিঃসঙ্গ বৃদ্ধের মতো তাকিয়ে আছে শহরের দিকে। সে চিৎকার করে বলতে চায় তার সোনালী অতীতের কথা, ১৯৪২ সালের সেই ব্যস্ত দুপুরের কথা, বাষ্পীয় ইঞ্জিনের সেই জৌলুসের কথা—কিন্তু তার কণ্ঠনালী চেপে ধরেছে আমাদের উদাসীনতা।

​পাঠক, এতক্ষণ আপনাকে আটকে রেখেছিলাম এক করুণ ইতিহাসের জালে। এবার আপনার মুক্তি। তবে এই মুক্তি স্বস্তির নয়, এক গভীর দায়বদ্ধতার। রেলের চাকা হয়তো ঘুরছে, কিন্তু যে ইতিহাস সেই চাকার জন্ম দিয়েছিল, তা যদি আমরা রক্ষা করতে না পারি, তবে একদিন আমাদের অস্তিত্বও ওই মরিচা ধরা লাইনের মতোই হারিয়ে যাবে।

​ট্রেন চলে গেছে অনেক আগেই। প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা। আমরা কি শুধু তাকিয়েই থাকব?

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *