ময়মনসিংহের সাবেক এসপি মইনুলের বিরুদ্ধে ভুয়া অস্ত্র মামলা ও সাংবাদিক নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ: প্রতিকার চেয়ে এসপির কাছে আবেদন

স্টাফ রিপোর্টার

ময়মনসিংহের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) মইনুল হকের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, শত একর সরকারি জমি দখল, ভুয়া অস্ত্র মামলা দিয়ে হয়রানি এবং পুলিশি হেফাজতে পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে এক শিক্ষানবিশ সাংবাদিককে হত্যার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। গত ৪ জুন ২০২৬ তারিখে ময়মনসিংহের বর্তমান পুলিশ সুপারের কাছে এই বিষয়ে একটি লিখিত আইনি আবেদন জমা দিয়েছেন আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘UK School of Artificial Intelligence Ltd’-এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মেহেদি হাসান নাদিম।

আবেদনে ২০১৬ সালের একটি বানোয়াট অস্ত্র মামলা (দায়রা মামলা নং ৪৪/২০১৬) থেকে অব্যাহতি প্রদান এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ (৮) ধারা অনুযায়ী মামলাটির অধিকতর তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। সম্প্রতি ‘জনস্বার্থে’ বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো সাবেক দুই এসপির মধ্যে মইনুল হক একজন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।

ঘটনার নেপথ্যে: ‘এসপি গরুর ফার্ম’ ও শত একর জমি দখল

আবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৫-২০১৬ সালে তৎকালীন এসপি মইনুল হক ফুলবাড়িয়া বন বিভাগের সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রায় ১০০ একর জমি জবরদখল করে একটি ব্যক্তিগত ডেইরি ফার্ম গড়ে তোলেন, যা স্থানীয়ভাবে “এসপি গরুর ফার্ম” নামে পরিচিত ছিল। তৎকালীন শিক্ষানবিশ ফটোসাংবাদিক রাসেল মিয়া (২৫) এই ভূমিদস্যুতার অনুসন্ধান ও তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে ডিবি পুলিশ এবং এসপির নজরদারিতে পড়েন।

পুলিশের ধারণা ছিল, এই অনুসন্ধানের পেছনে মূল মাস্টারমাইন্ড ছিলেন তার সম্পাদক মেহেদি হাসান নাদিম। এই অমূলক ভীতি থেকে দুর্নীতি ধামাচাপা দিতে ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে ডিবি পুলিশ ও কোতোয়ালি থানা পুলিশ মিলে একটি সাজানো অস্ত্র মামলার নাটক তৈরি করে এবং সম্পাদক নাদিম ও সাংবাদিক রাসেলকে গ্রেপ্তার করে।

হেফাজতে পৈশাচিক নির্যাতন ও সাংবাদিক রাসেলের মৃত্যু

আবেদনকারীর অভিযোগ অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডের নামে ডিবি পুলিশের তৎকালীন ওসি মোঃ ইমারত হোসেন গাজীর নেতৃত্বে রাসেল মিয়ার ওপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। পরবর্তীতে জামিনে মুক্ত হওয়ার কিছুদিন পরই পুলিশের এই নির্মম টর্চারের কারণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করেন এই তরুণ সাংবাদিক। নাদিম তাঁর আবেদনে এটিকে “দুর্নীতি ধামাচাপা দিতে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা একজন তরুণ সাংবাদিককে সুপরিকল্পিত হত্যার সমতুল্য” বলে উল্লেখ করেন।

মামলা জালিয়াতির ৫টি অকাট্য দালিলিক প্রমাণ

আবেদনে এই অস্ত্র মামলাটিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও সাজানো প্রমাণ করতে বেশ কিছু অকাট্য দালিলিক ও ফরেনসিক প্রমাণ সংযুক্ত করা হয়েছে:

  • বাদীর অডিও স্বীকারোক্তি: মামলার বাদী এসআই জাকির হোসেনের একটি অডিও জবানবন্দি রয়েছে, যেখানে তিনি স্বীকার করেছেন যে তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপে ও নির্দেশে তিনি মিথ্যা মামলা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ঘটনাস্থল থেকে কোনো অস্ত্র উদ্ধার হয়নি বলেও তিনি জানান।
  • ফরেনসিক রিপোর্টে জালিয়াতি: ঢাকা সিআইডি কর্তৃক দাখিলকৃত ফরেনসিক ব্যালেস্টিক রিপোর্টে (স্মারক নং- F.B 1-0019-2016) স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, উদ্ধারকৃত কথিত পিস্তলগুলোতে কোনো ট্রিগার, ফায়ারিং পিন বা মেইন স্প্রিং ছিল না। এগুলো নিছকই “লোহার টুকরো” বা অকেজো বস্তু ছিল।
  • তদন্ত কর্মকর্তার নজিরবিহীন জালিয়াতি: তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই ফারুক আহম্মেদ ১৭ জানুয়ারি ২০১৬-এর অভিযানের জব্দ তালিকায় স্বাক্ষর করেছেন ঘটনার ৯ দিন পর (২৬ জানুয়ারি)। এমনকি মামলা দায়েরের ৩ দিন পূর্বেই (১৪ জানুয়ারি) এক সাক্ষীর স্বাক্ষর নিয়ে রাখা হয়েছিল, যা চরম জালিয়াতির প্রমাণ।
  • শিশু অধিকার লঙ্ঘন: ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৩০-৪০ কিলোমিটার দূরের এক ১৬ বছরের নাবালককে এই স্পর্শকাতর মামলার মিথ্যা সাক্ষী বানানো হয়েছিল।
  • আদালতের আদেশে বৈপরীত্য: ২০১৬ সালের ১০ এপ্রিল আদালতের আদেশে “তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায় নাই” উল্লেখ থাকলেও, পরবর্তীতে ব্যাকডেট (১১ মার্চ ২০১৬) দিয়ে চার্জশিট প্রস্তুত দেখানো হয় এবং আলামতের সংখ্যা ৪৯টি থেকে জালিয়াতি করে ৫০টিতে উন্নীত করা হয়।

বর্তমান পরিস্থিতি: দুদকের অনুসন্ধান ও বাধ্যতামূলক অবসর

দীর্ঘ এক দশক পর এই ঘটনার সত্যতা প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সাবেক এসপি মইনুল হকের বিরুদ্ধে উক্ত ১০০ একর জমি দখলের আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে।

পাশাপাশি প্রাপ্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ স্বাক্ষরিত এক আদেশে সাবেক এসপি মইনুল হক ও শাহ আবিদ হোসেনকে সরকারি চাকরি আইন ২০১৮-এর ৪৫ ধারার বিধান অনুযায়ী জনস্বার্থে চাকরি থেকে অবসর প্রদান করা হয়েছে। অবসরকালীন সময়ে মইনুল হক সারদা পুলিশ একাডেমিতে কর্মরত ছিলেন।

আইনি প্রতিকারের দাবি

ভুক্তভোগী সাংবাদিক মেহেদি হাসান নাদিম ময়মনসিংহের বর্তমান পুলিশ সুপারের নিকট আবেদন জানিয়েছেন যেন বাদীর অডিও রেকর্ডটি সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে যাচাই করা হয় এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ (৮) ধারা অনুযায়ী অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিয়ে ৪৯৪ ধারা মোতাবেক এই হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলাটি সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়।

এই আবেদনের অনুলিপি সদয় অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং পুলিশ সংস্কার কমিশনের সদস্য সচিবসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক দপ্তরে প্রেরণ করা হয়েছে।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *