দক্ষিণ এশিয়ায় টেকসই কৃষি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সার্কের ৩ দিনব্যাপী আঞ্চলিক পরামর্শ সভা শুরু
নিজস্ব প্রতিবেদক

দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মধ্যে একটি পরিবেশবান্ধব ভারসাম্য রক্ষার কার্যকর উপায় খুঁজতে এক আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। “দক্ষিণ এশিয়ায় কৃষির নিবিড়তা বৃদ্ধি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ” শীর্ষক তিন দিনব্যাপী এই আঞ্চলিক পরামর্শ সভা আজ মঙ্গলবার (২৩ জুন) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। সার্ক কৃষি কেন্দ্র (SAC) আয়োজিত এই ভার্চুয়াল সভায় দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় কৃষি বিশেষজ্ঞ, পরিবেশ গবেষক ও নীতিপ্রণেতারা অংশ নিয়েছেন। সভার মূল লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি প্রতিবেশ সংরক্ষণে টেকসই কৃষি চর্চার জন্য শক্তিশালী সুপারিশমালা প্রণয়ন করা।
ফসলের নিবিড়তা ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য
উদ্বোধনী বক্তব্যে সার্ক কৃষি কেন্দ্রের পরিচালক ড. মো. হারুনূর রশীদ দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন—
“দক্ষিণ এশিয়ার ক্রমবর্ধমান বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পূরণে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। তবে তা করতে গিয়ে আমাদের প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না; দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। মাটির উর্বরতা বজায় রাখা, প্রাকৃতিক পরাগায়ন সেবা নিশ্চিত করা এবং প্রতিবেশগত স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধিতে জীববৈচিত্র্যের যে অনবদ্য ভূমিকা রয়েছে, তা আমাদের টেকসই কৃষি উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি।”
আঞ্চলিক এই সেমিনারের মূল উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সার্ক কৃষি কেন্দ্রের সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট (ক্রপস) ড. সিকান্দার খান তানভীর দক্ষিণ এশিয়ার সীমিত কৃষিজমির ওপর মানুষের ক্রমবর্ধমান অতিরিক্ত চাপের কথা উল্লেখ করেন। তিনি রাসায়নিক ও আধুনিক কৃষির নিবিড়তা বৃদ্ধির ফলে সামগ্রিক পরিবেশের ওপর যে দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তা নিবিড়ভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
পরিবেশগত ঝুঁকি ও টেকসই সমাধান
পরামর্শ সভার প্রথম দিনে মূল প্রবন্ধ (Keynote Paper) উপস্থাপন করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জীববৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞ এবং ইউএনডিপি (UNDP) ও এফএও (FAO)-এর আন্তর্জাতিক পরামর্শক ড. পশুপতি চৌধুরী। তিনি আধুনিক ও অতিরিক্ত নিবিড় চাষাবাদের ফলে স্থানীয় প্রতিবেশ ব্যবস্থা, পরাগবাহক মৌমাছি ও অন্যান্য প্রাণী, মাটির অভ্যন্তরীণ অণুজীবের বৈচিত্র্য এবং বন্য প্রাণীদের প্রাকৃতিক আবাসস্থলের ওপর সম্ভাব্য মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। পরিবেশগত এই ঝুঁকি ও বিপর্যয় কমাতে তিনি অবিলম্বে ঐতিহ্যবাহী ও টেকসই কৃষি চর্চা ফিরিয়ে আনা, একই জমিতে ফসলের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করা এবং পরিবেশবান্ধব ও জীববৈচিত্র্যবান্ধব আধুনিক প্রযুক্তির সুসমন্বিত ব্যবহারের ওপর জোর দেন।
আঞ্চলিক সহযোগিতা ও পরিপূরক লক্ষ্য
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সার্ক সচিবালয়ের পরিচালক (এআরডি ও এসডিএফ) তানভীর আহমেদ তরফদার বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জলবায়ু ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলো প্রায় অভিন্ন। তাই এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের খাদ্য ও পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং তথ্য ও জ্ঞান বিনিময়ের কোনো বিকল্প নেই।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ড. মো. আব্দুস সালাম তাঁর সমাপনী বক্তব্যে বলেন—
“আমাদের মনে রাখতে হবে, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কিন্তু পরস্পরবিরোধী কোনো বিষয় নয়; বরং এগুলো একে অপরের পরিপূরক লক্ষ্য। একটিকে ধ্বংস করে অন্যটি টিকিয়ে রাখা অসম্ভব।”
তিনি দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে যৌথ কৃষি গবেষণা সহযোগিতা জোরদার করা, তথ্য ও উপাত্তভিত্তিক আধুনিক নীতিনির্ধারণ এবং টেকসই কৃষি প্রযুক্তির উদ্ভাবনে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর জোর আহ্বান জানান। তিন দিনব্যাপী এই নিবিড় আলোচনা থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় টেকসই ফসল উৎপাদন এবং পরিবেশ রক্ষায় যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন ও কার্যকর আন্তর্জাতিক সুপারিশমালা বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
