জাতীয় সম্মাননা ‘বিপিএ বেস্ট প্রফেশনাল অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করলেন তরুণ অডিওলজিস্ট আহনাফ হাসান সোহাম
রাশিদ আহমেদ নিসর্গ, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি

দেশের স্বাস্থ্যসেবা ও সমাজকল্যাণ খাতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতীয় পর্যায়ের সম্মানজনক “BPA Best Professional Award 2026” (Season-02) অর্জন করেছেন ঢাকার তরুণ অডিওলজিস্ট ও স্পিচ-ল্যাংগুয়েজ প্যাথলজিস্ট আহনাফ হাসান সোহাম। তাঁকে “Medical Care & Social Work” ক্যাটাগরিতে এই গৌরবময় সম্মাননা প্রদান করা হয়।
গত ২০ জুন (শনিবার) ঢাকার সেগুনবাগিচাস্থ সেন্ট্রাল কচি-কাঁচা অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এক বর্ণাঢ্য আয়োজনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা বিশিষ্ট পেশাজীবী, উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবকদের মাঝে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের পরিধি
আহনাফ হাসান সোহামের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। তিনি রাজধানীর স্বনামধন্য মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে সফলতার সঙ্গে এসএসসি ও এইচএসসি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (BUP) থেকে অডিওলজি ও স্পীচ ল্যাংগুয়েজ প্যাথলজি বিষয়ে স্মাতক (বিএসসি) ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন থেকেই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু এবং বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষের কল্যাণে কাজ করার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়।
স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি বগুড়ার এনডিডিসি (NDDC)-তে কর্মজীবন শুরু করেন। সেখানে তিন মাস দায়িত্ব পালনের পর আবিদ হিয়ারিং সেন্টারে প্রায় পাঁচ মাস এবং পরবর্তীতে অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনে দীর্ঘ দেড় বছর সফলতার সঙ্গে কাজ করেন। বর্তমানে তিনি গত ১ বছর ৪ মাস ধরে “অটিজম ও এনডিডি সেবাদান কেন্দ্র, ময়মনসিংহ”-এ কনসালট্যান্ট (স্পিচ ও ল্যাংগুয়েজ থেরাপি) হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
ময়মনসিংহে মানবিক অবদান ও বিনামূল্যে সেবা
চাকরির সুবাদে ঢাকার স্থায়ী বাসস্থান ছেড়ে ময়মনসিংহে অবস্থান করলেও মানুষের সেবার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং ময়মনসিংহ অঞ্চলে শ্রবণ, বাক ও ভাষা বৈকল্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিশেষায়িত থেরাপি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে তিনি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
পেশাগত জীবনে তিনি অটিজম, নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅ্যাবিলিটি (NDD), ডাউন সিন্ড্রোম, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, সেরিব্রাল পালসি, স্ট্রোক-পরবর্তী বাক ও ভাষাগত সমস্যা এবং বিভিন্ন ধরনের যোগাযোগ বৈকল্য নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করছেন। তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রায় দুই হাজারেরও বেশি অসহায় ব্যক্তি ও শিশুকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শ্রবণ ও বাক-ভাষা বৈকল্য সংক্রান্ত মূল্যায়ন, পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় থেরাপি সেবা প্রদান করা হয়েছে, যা স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
যোগাযোগ প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার
একজন পেশাদার অডিওলজিস্ট ও স্পিচ ল্যাংগুয়েজ প্যাথলজিস্ট হিসেবে আহনাফ হাসান সোহাম দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, “যোগাযোগ করার অধিকার প্রতিটি মানুষের একটি মৌলিক অধিকার”।
পুরস্কার প্রাপ্তির অনুভূতি ব্যক্ত করে তিনি বলেন—
“এই সম্মাননা আমার একার নয়। এটি আমার বাবা-মা, পরিবার, শিক্ষক, সহকর্মী এবং বিশেষ করে আমার রোগী ও তাদের অভিভাবকদের ভালোবাসা ও অটল বিশ্বাসের ফল। যেসব শিশু ও পরিবার প্রতিনিয়ত নানা সামাজিক ও শারীরিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, থেরাপির মাধ্যমে তাদের মুখে একটুখানি হাসি ফোটাতে পারাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এই স্বীকৃতি আমাকে ভবিষ্যতে আরও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগাবে।”
তিনি দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আরও বলেন,
“বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনও শ্রবণ, বাক ও ভাষা বৈকল্য বিষয়ে পর্যাপ্ত সচেতনতা ও বিশেষায়িত সেবা পৌঁছায়নি। আমি চাই দেশের প্রতিটি মানুষ যেন এই প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার সুযোগ পায় এবং কোনো শিশুই যেন সঠিক থেরাপির অভাবে সমাজ থেকে পিছিয়ে না পড়ে।”
চিকিৎসা ও সমাজসেবা খাতে তাঁর এই অনন্য সাধারণ অবদান, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পেশাগত সততার যথার্থ স্বীকৃতি হিসেবেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁকে এই জাতীয় সম্মাননায় ভূষিত করেছেন বলে মনে করছেন দেশের বিশিষ্টজনেরা।
