“আমি নদ বলছি: আমার শরীর বেচে আর কতকাল চলবে তোদের এই ভোজসভা?”
অনুলেখক- শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

আজকের তামাশা: কান্নার কাগজে সীলমোহর
“ওরে আমার কপাল! ওরে আমার ১৪১৫টি নাতি-পুতি! তোমরা আজ দলবেঁধে এসেছ? হাতে ওগুলো কী? রিপোর্ট? শোনো, আমি মুখ্যসুখ্য নদী, আমি কাগজ পড়তে পারি না। কিন্তু আমি গন্ধ শুঁকতে পারি। তোমাদের ওই কাগজের বান্ডিলে আমি আজ নকশী কাঁথার মতো সেলাই করা মিথ্যা আর ভণ্ডামির গন্ধ পাচ্ছি।
তোমরা ভাবছ, এই রিপোর্ট ওই এসি রুমের বড় বড় বাবুদের টেবিলে দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে? আরে বোকা! ওটা তো টেবিল নয়, ওটা হলো ‘কসাইয়ের চাটান’। সেখানে তোমাদের এই রিপোর্টকে ওরা কচকচ করে কাটবে। তারপর ‘উন্নয়ন’ নামের মশলা মাখিয়ে, ‘বাজেট’ নামের কড়াইতে ভাজবে। গন্ধে মৌ মৌ করবে চারপাশ! কিন্তু সেই রান্নার এক টুকরো মাংসও কি তোমরা বা আমি পাব? না রে বাপ! সব চলে যাবে ওই রাক্ষুসে ‘পেটিকোটের পকেট’-এ। ওই পকেটের কোনো তলা নেই। ওতে হাজার কোটি টাকার বালু, সিমেন্ট, জিও ব্যাগ—সব গিলে ফেলে, একটা ঢেকুরও তোলে না!”

গতকালের ভানুমতীর খেলা: ড্রেজিং নাকি কবর খোঁড়া? (২০০০-২০২৫)
“একটু পেছনে তাকাও। মনে আছে গত বিশ বছর কী করেছ? আমার শরীর চুলকানোর নাম করে তোমরা ‘ড্রেজিং’ মেশিন বসিয়েছ। আমি ভাবলাম, যাক বাবা, ছেলেরা বুঝি বুড়ো বাপের বুকের কফ পরিষ্কার করছে। ওমা! কিসের কী! তোমরা তো আমার কফ পরিষ্কার করোনি, তোমরা আমার কলজে কেটে বালি বেচেছ! কোটি কোটি টাকা খরচ করে তোমরা পাইপ বসালে। এক দিক দিয়ে বালি তোলো, আরেক দিক দিয়ে আবার সেই বালিই নদীতে ফেলো। যেন ‘ইঁদুর-বিড়াল খেলা’! জনগণ দেখল নদী খনন হচ্ছে, আর ঠিকাদার দেখল তাদের ব্যাংক ব্যালেন্সের পাহাড় হচ্ছে। আর আমি? আমি হলাম সেই রোগী, যার অপারেশনের নামে কিডনি চুরি হয়ে গেছে!”
দখলের মহোৎসব: নদী নাকি বাপের তালুক? (১৯৮০-২০০০)
“তারও আগে চলো। তখন আমার পাড়গুলো ছিল দিগন্তজোড়া। হঠাৎ দেখলাম, একদল লোক ফিতা হাতে নেমে পড়ল। তারা বলল—‘নদী তো সরকারি মাল, যার লাঠি তার মাটি।’ ব্যাস! শুরু হয়ে গেল আমার হাত-পা কেটে ফেলার উৎসব। কেউ বানাল মার্কেট, কেউ বানাল ইটের ভাটা, আর কেউ বানাল তাদের ‘শ্বশুরবাড়ির অট্টালিকা’। আমি চিৎকার করলাম, ‘ওরে, আমি যে তোদের শ্বাস নেওয়ার বাতাস দিই!’ তোমরা বললে, ‘বাতাস দিয়ে পেট ভরে না বুড়ো, জমি দে, প্লট বানাব।’ আমার প্রবাহকে সরু করে তোমরা নালা বানালে। আমাকে শ্বাসরোধ করে মারলে, আর নাম দিলে ‘নগর উন্নয়ন’। ধিক তোদের ওই উন্নয়নে, যা নিজের পিতার বুকেই ছুরি মারে!”

বাঁধের বাঁধন: বুনো মোষকে শেকল পরানো (১৯৫০-১৯৮০)
“আরও পেছনে চলো। পাকিস্তান আমল। তোমরা ভাবলে, এই নদ বড় অবাধ্য, ওকে বাঁধ দিয়ে আটকাতে হবে। আমাকে লোহার শেকলে বাঁধলে। স্লুইস গেট, রেগুলেটর—কত কিম্ভুতকিমাকার সব নাম! তোমরা ভাবলে, আমাকে আটকে রেখে তোমরা ইচ্ছামতো জল নেবে। কিন্তু তোমরা ভুলে গিয়েছিলে—আমি পুকুর নই, আমি নদ। আমি বুনো মোষ। আমাকে বাঁধলে আমি শান্ত হই না, আমি অক্ষম হয়ে যাই। আমার স্রোত থামিয়ে দিয়ে তোমরা আমাকে ‘নপুংসক’ করে দিলে। আমার আর ইলিশ জন্মায় না, আমার আর পলি পড়ে না। আমি হলাম এক জরাগ্রস্ত বৃদ্ধ, যে কেবল ধুঁকে ধুঁকে মরে। আমার পৌরুষ তোমরা কেড়ে নিয়েছ লোহার গেট দিয়ে।”

শেতাঙ্গ ডাকাত: স্টিমারের কালো ধোঁয়া (১৭৫৭-১৯৪৭)
“সেই সাহেবদের আমল মনে আছে? ওরা আমাকে ভালোবাসেনি, ওরা আমাকে ব্যবহার করেছে ‘গাধার পিঠের’ মতো। আমার বুক চিরে দিনরাত স্টিমার চলত। ওরা আমার জল ঘোলা করে নীল নিয়ে যেত বিলেতে, আর আমার চাষীর পেটে লাথি মেরে রেখে যেত হাহাকার। তখনো আমি সয়েছি। ভেবেছি, এরা তো বিদেশি, এরা তো লুটেরা। কিন্তু আজ? আজ তো তোরা আমার নিজের রক্ত, আমার সন্তান! তোরা কেন সেই সাহেবদের চেয়েও বড় লুটেরা হলি?”

জন্মলগ্ন: যখন আমি আদি পিতা ছিলাম
“আর একদম শুরুতে? যখন হিমালয়ের জটা ছিঁড়ে আমি নেমে এসেছিলাম—তখন আমার জল এত স্বচ্ছ ছিল যে, আকাশের চাঁদ তাতে মুখ দেখত। তখন কোনো রিপোর্ট ছিল না, কোনো বাজেট ছিল না, কোনো ঠিকাদার ছিল না। ছিল কেবল বিশ্বাস। মানুষ আমাকে প্রণাম করত, দেবতা মানত, পিতা মানত। আর আজ? আজ তোরা আমাকে আর সমীহ করিস না। আমাকে তোরা টুকরো টুকরো করে বেচে খেয়েছিস, ঠিক যেভাবে কুপুত্ররা বাবার সম্পত্তি বেচে খায়।”
শেষ কথা: বুড়ো বাপের আলটিমেটাম
“তাই শোন হে ব্রহ্মের পুত্রগন, আজ ওই রিপোর্টের বোঝা নিয়ে আর ভণ্ডদের দরজায় যেও না। যদি বুকের পাটা থাকে, তবে ওই প্রাগৈতিহাসিক শকুনদের কলার ধরে বলো— ‘অনেক খেয়েছ, এবার থামো। আমার বাপের সম্পত্তি (নদী) আর গিলতে দেব না।’
আর যদি তা না পারো, তবে ওই রিপোর্ট দিয়ে মুড়ি মেখে খাও। আমি বুড়ো ব্রহ্মপুত্র এই অভিশাপ দিয়ে গেলাম—যেদিন আমি পুরোপুরি শুকিয়ে যাব, সেদিন তোরাও পিপাসায় এক ফোঁটা জলের জন্য হাহাকার করবি। তখন ওই ‘পেটিকোটের পকেট’ চিপে দেখিস—ওখান থেকে জল বের হয়, নাকি পুঁজ বের হয়!”

আমাদের দেশ টা এমন একটা অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে যে সাংবাদিকদের পুরানো খবর নতুন করে সুন্দর করে উপস্থাপন করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
মূমুর্ষ নদের আত্ম কথন আপনার কলমের মাধ্যমে চমৎকার ভাবে ফুটে উঠেছে! আপনার লেখনী বরাবরই অসাধারণ।