অশ্রুভেজা শপথ এবং ‘নিয়ত’-এর পরীক্ষা

তারেক রহমান, আপনাকে বলছি: পর্ব-৩

শেখ মেহেদী হাসান নাদিম

রাজনীতিতে আবেগের স্থান খুব সামান্য, সেখানে সমীকরণই শেষ কথা—এমনটাই আমরা দেখে আসছি যুগের পর যুগ। কিন্তু গত ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে গুম ও খুনের শিকার পরিবারগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে আপনি যখন বলছিলেন, তাঁদের কষ্টের কথা শুনতে শুনতে আপনি বারবার ‘খেই হারিয়ে ফেলছিলেন’, তখন মনে হলো—রাজনীতির চেনা ব্যাকরণের বাইরে কোথাও একটা মানবিকতার সুতো বোনা হচ্ছে।

​তারেক রহমান, আপনার আগের পর্বগুলোতে আমি নেতৃত্বের ‘যদি-কিন্তু’র বেড়াজাল নিয়ে কথা বলেছি। আজ আমি কোনো রাজনৈতিক পরিসংখ্যান বা কৌশলের কথা বলব না। আজ কথা বলব সেই অদৃশ্য শক্তি নিয়ে, যা একজন নেতাকে ‘মানুষ’ থেকে ‘মোহাইমিনুল’-এ পরিণত করে।

বিবেকের আয়নায় ওপারে

গতকাল আপনি যখন বলছিলেন, “আমাদের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি ছিল না… আমরা কতটুকু পেরেছি তার জবাব ভিন্ন”—তখন আপনার কণ্ঠে এক ধরনের আত্মসমর্পণের সুর ছিল। আপনি স্বীকার করেছেন সীমাবদ্ধতার কথা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ভুল স্বীকার’ বা ‘সীমাবদ্ধতা স্বীকার’ করার সংস্কৃতি নেই বললেই চলে। কিন্তু আপনি সেই প্রথা ভেঙেছেন।

​এখানেই আপনাকে একটি কথা বলতে চাই। রাজনীতিতে জনসমর্থন জোয়ার-ভাটার মতো। আজ যে জনসমুদ্র আপনার পক্ষে গর্জন করছে, কাল তা নীরব হয়ে যেতে পারে। আবার কেউ ভোট দিক বা না দিক, ব্যালট বাক্স পূর্ণ হোক বা শূন্য থাক—এসবের চেয়েও বড় ও শক্তিশালী বিষয় হলো আপনার ‘নিয়ত’। আপনার হৃদয়ের গহীনে লুকানো সেই সংকল্প বা ‘নিয়ত’—যা কেবল আপনি জানেন আর জানেন মহান রাব্বুল আলামিন। গতকালের অশ্রুভেজা চোখে আপনি যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা যদি লোকদেখানো না হয়ে অন্তরের বিশ্বাস থেকে উৎসারিত হয়, তবে সেটিই হবে আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি।

বিশ্বাস ও অবিচল যাত্রা

আপনি বক্তৃতায় একাধিকবার মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করার কথা বলেছেন। গুম হওয়া সন্তানের হাহাকার শুনে বলেছেন, “একমাত্র আল্লাহ জানেন সেই সন্তান তার বাবাকে আর দেখবে কি না।” এই যে জাগতিক ক্ষমতার বাইরে এক পরম শক্তির ওপর নির্ভরতা—এটি একজন বিশ্বাসী মানুষের দৃঢ় সত্তার পরিচয়।
​বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা বড়ই নিষ্ঠুর ও পিচ্ছিল। ষড়যন্ত্রের জাল, নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত ভূমিকা আর স্বজনহারাদের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে এক কঠিন সময়।

এই সময়ে আপনাকে বলছি—আপনি কেবল আপনার সেই ‘সৎ নিয়ত’-এর অনুসারী হোন। ভোটের রাজনীতি বা ক্ষমতার অঙ্ক কষতে গিয়ে সেই নিয়ত যেন কলুষিত না হয়। আপনি যদি মজলুমের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে আপনার সংকল্পে অটুট থাকেন, তবে জাগতিক ফলাফল যা-ই হোক না কেন, ইতিহাসের পাতায় আপনি বিজয়ী থাকবেন।

দায়বদ্ধতা যখন প্রতিশ্রুতির চেয়ে বড়

শহীদদের নামে সড়কের নামকরণ বা রাষ্ট্রীয় সহায়তার যে প্রতিশ্রুতি আপনি দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু এর চেয়েও বড় হলো সেই প্রতিশ্রুতি, যা আপনি নিজের বিবেকের কাছে করেছেন। আপনি বলেছেন, “রাষ্ট্র কখনোই আপনাদের ভুলে যেতে পারে না।” এই বাক্যটি যেন কেবল রাজনৈতিক বুলি না হয়।

​আপনার চারপাশে এখন হয়তো তোষামোদকারীর ভিড় বাড়বে, ক্ষমতার স্বাদ পেতে অনেকে ভিড়বে। কিন্তু গতকাল মঞ্চের সামনে বসা ওই স্বজনহারা মানুষগুলোর কান্নার শব্দ যেন সেই ভিড়ে হারিয়ে না যায়। আপনার ‘নিয়ত’ যদি স্বচ্ছ থাকে, তবে এই কান্নাগুলোই হবে আপনার পথচলার পাথেয়।

শেষ কথা

তারেক রহমান, গতকালের বক্তৃতায় আপনি যে মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, তা বাস্তবায়নের চাবিকাঠি আপনার হাতে নয়, আপনার ‘ইচ্ছা’ বা ‘ইনটেনশন’-এর ওপর নির্ভর করছে। আপনি আপনার কাজ করে যান, ন্যায়ের পথে অবিচল থাকুন। কে পাশে থাকল আর কে থাকল না, কে ভোট দিল আর কে দিল না—তা নিয়ে বিচলিত হবেন না। কারণ, বিশুদ্ধ নিয়ত নিয়ে যিনি সত্যের পথে হাঁটেন, বাকি পথের ভার বা ফলাফলের দায়িত্ব স্বয়ং উপরওয়ালাই গ্রহণ করেন।

​আপনার এই অশ্রুসজল আর্তি আর শপথ যেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন ভোরের সূচনা করে—সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *