গণভোটের রায় হোক সংস্কারের পক্ষে

মো: মাসুদ মিয়া

গণভোট এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে জনগণ সরাসরি ভোট দেওয়ার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে তাদের মতামত দেয়। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনমত যাচাইয়ের জন্য এটি একটি অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে ১৯৭৭, ১৯৮৫ এবং ১৯৯১ সালে তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাথে একযোগে চতুর্থবারের মতো একটি ঐতিহাসিক গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

কেন এই গণভোট?

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিশ্চিত করতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষা পূরণের রূপরেখা হলো ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’। ভবিষ্যতে যাতে কোনো সরকার স্বৈরাচারী বা ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে না পারে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত হয়, সেজন্যই এই জনমত যাচাই।

ভোটের পদ্ধতি: দুটি ব্যালট

এবারের নির্বাচনে ভোটাররা দুটি ব্যালট পাবেন: ১. সাদা ব্যালট: সংসদ সদস্য (MP) প্রার্থীদের পছন্দের প্রতীকে ভোট দেওয়ার জন্য। ২. গোলাপী ব্যালট: গণভোটের জন্য। এখানে সীল নয়, বরং ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ বক্সের ওপর টিক চিহ্ন (✔) দিতে হবে।

বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এবারই প্রথম প্রবাসী বাংলাদেশিরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

ব্যালটে যা থাকছে: চারটি প্রধান প্রস্তাব

গোলাপী ব্যালটে মূলত চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের সম্মতি চাওয়া হয়েছে:

  • (ক) তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান: নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার এবং নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো জুলাই সনদের আলোকে গঠন।
  • (খ) দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ: ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে, যা সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
  • (গ) ক্ষমতার ভারসাম্য: প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর (দুই মেয়াদ), বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি।
  • (ঘ) অপরাপর সংস্কার: রাজনৈতিক দলগুলো এসব সংস্কার বাস্তবায়নে আইনত বাধ্য থাকবে।

কেন ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া জরুরি?

সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। সংস্কার প্রস্তাবগুলো মূলত জনগণের কল্যাণেই রচিত। যেমন:

  • মেধাবীদের কর্মসংস্থান: পিএসসি নিরপেক্ষ হলে মেধাবীরা যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি পাবে।
  • স্বৈরতন্ত্র রোধ: প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা এককেন্দ্রিক না থেকে সংসদে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ (ডেপুটি স্পীকার ও কমিটির সভাপতি পদ) বৃদ্ধি পাবে।
  • ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ: গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে তা পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়াবে।

সতর্কতা ও সচেতনতা

পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র বা এআই (AI) প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি ‘ডিপফেক’ ভুয়া ভিডিও বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে। তাই কোনো অপপ্রচারে কান না দিয়ে যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

উপসংহার: দেশের চাবি এখন আপনার হাতে। জুলাই সনদ ও সংস্কার প্রস্তাবগুলো সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার রক্ষাকবচ। মনে রাখতে হবে, বুলেটের চেয়ে ব্যালট শক্তিশালী। তাই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি আমাদের সাহসী ও সুচিন্তিত ভূমিকা পালন করতে হবে। সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে একটি সুন্দর ও বৈষম্যহীন আগামীর বাংলাদেশ গড়াই হোক আমাদের লক্ষ্য।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *