পলিন কাউসার

সামনাসামনি দাঁড়ালে আপনার একবারের জন্যও মনে হবে না যে আপনি কোনো ব্যস্ত শহরের রেল স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। মনে হবে, কালের গহ্বর থেকে উঠে আসা বিশাল এক প্রত্নতাত্ত্বিক ‘ফার্নিচার’ চোখের সামনে স্থির হয়ে আছে। ১৮৯৬ সালে ব্রিটিশ কারিগরদের নিখুঁত হাতে বানানো সেগুন কাঠের মতো মজবুত, ভিক্টোরিয়ান নকশায় মোড়ানো এই স্থাপত্যটি এতটাই শৈল্পিক যে, এর দিকে তাকালে বর্তমান সময়টা কিছুক্ষণের জন্য থমকে যায়।
আজ থেকে ১৩৩ বছর আগের কথা। আসামের চা-বাগানগুলোর সজীবতাকে বাণিজ্যে রূপ দিতে ব্রিটিশরা যখন এই জনপদে রেললাইনের গোড়াপত্তন করেছিল, তখন কেবল যাতায়াতই তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। ছিল আভিজাত্য আর ক্ষমতার প্রদর্শন। আর সেই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন একজন—‘স্টেশন মাস্টার’।
মাস্টারের অন্দরমহল ও গোপন সিঁড়ির রহস্য
ভবনটির দিকে তাকালে আপনার চোখ আটকে যাবে এর পূর্ব পাশের বিশাল গম্বুজ বা ‘টপ ডোম’-এর দিকে। তার সঙ্গেই আলিঙ্গন করে আছে একটি ‘সেমি অক্টাগোনাল’ বা অর্ধ-অষ্টভুজাকৃতির মিনার। ১৮৯৬ সালের ৭ই নভেম্বর যখন প্রধান প্রকৌশলী ব্রাউনজার এই ভবনটি দাঁড় করিয়েছিলেন, তখন এই মিনারটি তিনি অকারণে বানাননি।
মিনারের পেটের ভেতর দিয়ে পেঁচিয়ে ওপরে উঠে গেছে একটি সুদৃশ্য, অন্ধকার সিঁড়ি। এই সিঁড়ি যাত্রীদের জন্য ছিল না, ছিল না সাধারণ রেল কর্মচারীদের জন্যও। তবে কার জন্য ছিল এই রাজকীয় আয়োজন?
ইতিহাসের ধুলো সরালে দেখা যায়, এই সিঁড়িটি সোজা গিয়ে ঠেকেছে দোতলার একটি বিশেষ দরজায়—স্টেশন মাস্টারের খাস কামরায়। নিচতলায় যখন বাণিজ্যের কোলাহল আর যাত্রীদের ব্যস্ততা চলত, তখন ওপরতলায় স্টেশন মাস্টার থাকতেন এক রাজকীয় নিস্তব্ধতায়। তার ব্যক্তিগত গোপন সিঁড়ি, তার জন্য নির্ধারিত প্রশস্ত বারান্দা—সব মিলিয়ে এটি ছিল তার ‘দুর্গ’। তিনি যখন ওপর থেকে নিজের ডেরায় প্রবেশ করতেন, তখন মনে হতো কোনো লর্ড তার ক্যাসলে প্রবেশ করছেন।

রাজকীয় ফার্নিচারে ঘুণপোকার হানা
কিন্তু হায়! খুব দামী আসবাব ঘরে থাকলে গৃহস্থের যেমন ভয় থাকে ঘুণপোকার, ঠিক তেমনি চট্টগ্রাম শহরের এই ঐতিহাসিক ফার্নিচারটিতেও বাসা বেঁধেছে একদল মানব-রূপী ‘ঘুণপোকা’। দিনের আলোয় এই স্থাপত্য একরকম, কিন্তু সূর্য ডুবলেই এর রূপ বদলে যায়।
যেখানে একসময় হ্যাট-কোট পরা ব্রিটিশ কর্মকর্তারা জুড়িগাড়ি থেকে নামতেন, সেই প্রশস্ত ‘পোর্ট কোচার’ বা গাড়ি বারান্দায় আজ নামেন নেশাখোর আর ভবঘুরেরা। সন্ধ্যার অন্ধকার নামলেই স্টেশন চত্বর চলে যায় এক অদৃশ্য ছায়ার দখলে। স্থানীয়দের ফিসফিসানি আর ইতিহাসের নির্মম সত্য একাকার হয়ে বলে—একাত্তরের সেই অভিশপ্ত দিনগুলোর পাপ আজও এই এলাকা ছেড়ে যায়নি। সেই পাপী আত্মাগুলোই যেন আজ ‘প্রেতাত্মা’ হয়ে ফিরে এসেছে। আজকের এই নেশাখোর, এই অসামাজিক কার্যকলাপ—এরা যেন সেই পুরোনো পাপেরই নতুন রূপ। সেই প্রেতাত্মারাই আজ ‘ঘুণপোকা’ হয়ে সন্ধ্যার অন্ধকারে কুরে কুরে খাচ্ছে আমাদের ইতিহাসের এই অমূল্য দলিলকে।
অপেক্ষার প্রহর…
আজকের এই জরাজীর্ণ ভবন, অসামঞ্জস্যপূর্ণ সাইনবোর্ড আর পলেস্তারা খসা দেওয়ালের দিকে তাকালে মনে হয়, সেই স্টেশন মাস্টার আজও হয়তো ওপরতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি দেখছেন তার সাজানো বাগান কীভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু এই গল্পের এখানেই শেষ নয়। এই স্টেশনের পাশেই, আরেকটু গভীরে লুকিয়ে আছে রেলের আরেকটি ‘হৃদপিণ্ড’। যেখানে লোহা কেবল লোহা নয়, যেখানে বাতাসের সাথে মিশে আছে বারুদ আর রক্তের গন্ধ। সেই গল্প আরও করুণ, আরও লোমহর্ষক।
(চলবে…)
