পুলিশি সেবায় ইতিহাস গড়া একটি নাম, তাড়াইল থানার বিদায়ী ওসি সাব্বির রহমান
মুকুট রঞ্জন দাস,তাড়াইল ( কিশোরগঞ্জ)

একজন পুলিশ কর্মকর্তার অবস্থান শুধু একটি প্রশাসনিক পদেই সীমাবদ্ধ নয়—তিনি জনগণের নিরাপত্তা, আস্থা ও ন্যায়বিচারের প্রতীক। কিশোরগঞ্জের তাড়াইল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাব্বির রহমান ছিলেন সেই প্রতীকের বাস্তব রূপ। গত ৩০ নভেম্বর ২০২৪ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি যে কর্মদক্ষতা, সততা এবং দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন, তা তাড়াইলের মানুষের কাছে এক ইতিহাস হয়ে থাকবে। আজ রবিবার (০৭ ডিসেম্বর ‘২৫) টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর থানায় বদলিজনিত কারণে তাড়াইল থেকে বিদায় নিয়েছেন।
কঠিন সময়ে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ
২৪ এর ৫ আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতা সারাদেশে যখন উত্তাপ ছড়ায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যখন প্রতিনিয়ত অবনতি ঘটে, তাড়াইল তখন ছিল সবচেয়ে নাজুক অবস্থায়। পুলিশ সদস্যদের মনোবল কমে আসে, সাধারণ মানুষের মনে ভয় ছড়ায়, দালালচক্র সক্রিয় হয়ে পড়ে। ঠিক এমন এক কঠিন মুহূর্তে ওসি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন সাব্বির রহমান।
- দালালমুক্ত থানা: শুরু থেকেই তিনি যে সিদ্ধান্তটি নেন, তা হলো থানাকে সম্পূর্ণ দালালমুক্ত করা। ওসি সাব্বির রহমান দালালদের থানার কাজকর্মে দূরে সরিয়ে দিয়ে সরাসরি জনগণের কাছে সেবা পৌঁছে দেন। এই এক সিদ্ধান্তেই তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করেন।
- অপরাধ দমন: তার নেতৃত্বে তাড়াইলে মাদকবিরোধী অভিযান চোখে পড়ার মতোভাবে বাড়ে। সন্ত্রাসী কার্যক্রম, চুরি, ছিনতাই ও অপকর্ম কমাতে তিনি তৈরি করেন বিশেষ টহল টিম। অপরাধীদের মধ্যে ভয় তৈরি হয়—তাড়াইলে অপরাধ করলে ছাড় নেই।
- ট্রাফিক শৃঙ্খলা: তাড়াইল বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিশৃঙ্খল ছিল। ওসি সাব্বির দায়িত্ব নেওয়ার পর নিয়মিত চেকপোস্ট, সচেতনতা কার্যক্রম ও আইন প্রয়োগের ফলে ট্রাফিক ব্যবস্থায় আসে দৃশ্যমান পরিবর্তন।

জনবান্ধবতা ও আবেগঘন বিদায়
তাড়াইল থানায় আগে অনেকেই যেতে ভয় পেতেন বা অস্বস্তি বোধ করতেন। কিন্তু সাব্বির রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর ওসির রুম হয়ে ওঠে সবার জন্য উন্মুক্ত। কৃষক, রিকশাচালক, দিনমজুর, নারী—যে কেউ সরাসরি গিয়ে নিজের কথা বলতে পারেন। হাসিমুখে, মনোযোগ দিয়ে শুনতেন তিনি। এ কারণে সাধারণ মানুষ মনে করেন, সাব্বির রহমান ছিলেন তাঁদের সবচেয়ে সহজপ্রাপ্য ওসি।
রবিবার সকাল ১১টায় তাড়াইল থানা চত্বরে ওসি সাব্বির রহমানের বিদায়ী মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন তাড়াইল-করিমগঞ্জের এসপি সার্কেল সুবীর বসাক। তাছাড়া উপস্থিত ছিলেন তাড়াইল উপজেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় সাংবাদিকবৃন্দ এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
তার বিদায়ের দিন থানার সামনে এক আবেগঘন দৃশ্য তৈরি হয়। সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি অনেকে ছুটে আসেন তাকে বিদায় জানাতে। কেউ অশ্রুসিক্ত হয়ে বলেন, “আপনি চলে গেলে আমরা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবো না তো?” কেউ করমর্দন করে আক্ষেপ করেন, এমন একজন সৎ ওসি আবার কবে মিলবে?
বিদায়ের মুহূর্তে ওসি সাব্বির রহমানও আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাড়াইলবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সুশীল সমাজ বলছে, সততা, ন্যায়বিচার ও পেশাগত দক্ষতার এক অনন্য উদাহরণ ছিলেন ওসি সাব্বির। তার নেতৃত্বে তাড়াইল যেভাবে বদলে গেছে, তা দীর্ঘদিন স্মরণ রাখবে এ উপজেলার ইতিহাস।
